লকডাউনেও থেমে নেই পাহাড় ও ফসলি জমি কাটা

খাগড়াছড়িতে বালু উত্তোলন, পাহাড় ও ফসলি জমি, মাটি কাটার মহোৎসব যেন আর থামছেই না। 

বরং পার্বত্য খাগড়াছড়িতে অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাহাড় কাটা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। পাহাড় ও ফসলি জমির উর্বর স্তর কেটে ইট ভাটার ইট পোড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসকল অবৈধ কাজে জড়িয়ে রয়েছেন কিছু প্রভাবশালী মহল। 

বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত লকডাউনেও থেমে নেই পাহাড় ও ফসলি জমি কাটা কাজ। খাগড়াছড়ির জেলার মাটিরাঙ্গা, মানিকছড়ি, লক্ষীছড়ি, পানছড়ি, দিঘিনালা, গুইমারার তৈকর্মা, চিংড়িপাড়া, বাইল্যাছড়িতে অবৈধভাবে নির্বিচারে পাহাড় ও ফসলি জমির উর্বর স্তরের মাটি কেটে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করছে ৯ টি উপজেলার সিন্ডিকেট চক্র।

খাগড়াছড়িতে বালু উত্তোলনের সাথে রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব খাটিয়ে পাহাড় কাটা ও খাল গুলো থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতেই তারা ক্ষান্ত নয়, কেটে নিচ্ছে খালের দুই পাড়ের প্রায় ১৫০-২০০ ফুটের মতো। এতে এক দিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব, অন্যদিকে বর্ষার ভরা মৌসুমে খালের ভাঙ্গন আগ্রাসী রূপ ধারণ করে বিপজ্জনক হয়ে উঠে খালপাড়ে বসবাসরত ছিন্নমূল মানুষ গুলোর জন্য।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার বাইল্যাছড়ি, চিংড়িপাড়া, তৈকর্মা এলাকায় আবহমান পাহাড় ও খাল থেকে কিছু দুষ্ট চক্র লোকেরা দিনের পর দিন এমন অপরাধ করে গেলেও প্রশাসনের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন তারা।

খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি, দীঘিনালা, পানছড়ি, মানিকছড়ি সহ অন্যান্য উপজেলায় বিগত কয়েক বছরে প্রায় দুইশত একর জমি খালের ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে।

স্থানীয় এক কৃষক বলেন, বালু খেকোদের এমন আগ্রাসী কাণ্ডে আমরা খালপাড়ে বসবাসরত কৃষকরা ভয় ও উৎকণ্ঠায় থাকি। কারণ একদিকে আমাদের বসতবাড়ি যেমন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে তেমনি ফসলের জমিগুলো খালের ভাঙ্গনে বর্ষায় হারিয়ে যাবে। তাছাড়া পাহাড়গুলো কেটে মাটি নেওয়া পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত পরিবারগুলোর যেকোনো সময় পাহাড় ধ্বসে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে। 

তৈকর্মা এলাকায় মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করে ট্রাকে ট্রাকে পাচার করার ব্যাপারে ড্রাম ট্রাকে স্কাভেটর ড্রেজার মেশিনের পরিচালনাকারী এক ব্যক্তি জানান, আমার দুইটি স্কাভেটর ড্রাম ট্রাকে ড্রেজার মেশিন দিয়ে মাটি কাটছি ব্রিকফিল্ডের কাজের জন্য।

সচেতন মহল মনে করেন এই ভাবে ফসলি জমির মাটি অবৈধ ইটভাটার মালিকেরা কেটে নিয়ে গেলে ফসল ফলানোর কাজ বিঘ্নিত হবে এবং এলাকার ফসল উৎপাদন ব্যাঘাত ঘটবে।

তাছাড়াও রাতদিন বিরতিহীন ভাবে মাটি বহনকৃত ট্রাক চলার কারণে ধুলাবালিতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ ইট সলিং রাস্তা। 

জেলার নয়টি উপজেলার ইটভাটার প্রতিদিন স্কাভেটর, ড্রাম ট্র্রাক দিয়ে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার গাড়ি করে। অবৈধ ভাবে পাহাড় কাটা ও বালু উত্তোলন রোধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী ।

অপরদিকে, মানিকছড়ি প্রতিনিধি জানান, মানিকছড়িতে পাহাড় কাটা বা বনাঞ্চল ধ্বংস করা যেন নিত্য দিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নির্বিচারে পাহাড় কাটছে একটি চক্র। কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রকাশ্যে চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব। পাহাড় সমতল করে নির্মাণ করা হচ্ছে স্থাপনা। ফসলি জমির টপ সয়েল (উপরিভাগের মাটি) অন্যত্র বিক্রি করছে জমির মালিকের সাথে যোগসাজশে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। এতে করে একদিকে পরিবেশ হারাচ্ছে তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য, অন্যদিকে প্রাণিকুল হারাচ্ছে নিরাপদ আবাসস্থল। তবে এ ব্যাপারে কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছে না প্রশাসন। দেখেও না দেখার ভান করায় প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে স্থানীয়দের মনে। 

উপজেলার বিভিন্ন স্থান ঘুরে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায় , গত বছরের শেষের দিকে ও চলতি বছর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে পাহাড় কাটা চক্রের লোকজন নির্বিচারে ছোট-বড় পাহাড় বা টিলা কেটে চলেছে। কখনও কখনও রাতের অন্ধকারে ড্রেজার মেশিন দিয়ে , আবার কখনও কখনও দিনমজুর দিয়ে মাটি কেটে সাবাড় করছে পাহাড় । অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মাটি কাটার সিন্ডিকেটটি পাহাড় বা টিলার মালিককে ফুসলিয়ে তার জমিন (পাহাড় বা টিলা) সমান করে দেওয়ার কথা বলে মাটি কেটে তা অন্যত্র বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রায় ৩৫-৫০ ফুট ধারণকৃত ট্রলি পাহাড়ি মাটি বিক্রি করছে ৮ শত থেকে ১ হাজার টাকা করে। তাছাড়া পাহাড় কেটে সমতল করে অন্যায়ভাবে ছোট-বড় প্লট তৈরি করে বিক্রিও করছে তারা। এতে পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে ফাটলের দেখা দিয়েছে। প্রবল বর্ষণে পাহাড়গুলো ধসে যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ৬ (খ) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারি বা আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করতে পারবে না। তবে অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে পাহাড় বা টিলা কাটা যেতে পারে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। 

অচিরেই, এসকল অবৈধ বালু উত্তোলন, পাহাড় কাটা ও ফসলি জমির উর্বর স্তর কাটা বন্ধ করা না হলে পরিবেশের ভারসাম্য ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তারা উপজেলা প্রশাসনকে সাহসী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

মন্তব্য লিখুন :