লাখ টাকার চুক্তিতে ৪ জেলেকে বঙ্গোপসাগরে ফেলে হত্যা

চায়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর চার ঘুমন্ত জেলেকে বঙ্গোপসাগরে ফেলে হত্যার রহস্য বের করেছে পুলিশ।

সোমবার (১৯ জুলাই) সন্ধ্যায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও লক্ষ্মীপুরের রামগতির বড়খেড়ি নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. বেলাল হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গোপনীয়তা রক্ষা করে সঙ্গে জড়িত অন্য দুইজনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

নিহতরা হলেন- রামগতি উপজেলার সোনালী গ্রামের নাসির উদ্দিন মাঝি (৪৬), তার ছেলে মো. রিয়াজ (১১), নোয়াখালীর চরজব্বর এলাকার আবদুল মালেকের ছেলে মো. করিম (৪৬) ও একই এলাকার আমির হোসেনের ছেলে মো. মিরাজ (১৭)।

অন্যদিকে গ্রেফতাররা হলেন- চট্টগ্রামের বাকলিয়া নতুন ফিশারিঘাট এলাকার আবুল কাশেমের ছেলে আড়তদার ইউছুফ মিয়া, যশোরের চৌগাছার দক্ষিণ কয়ারপাড়া এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে মো. রাসেল, লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের পূর্বচরফলকন গ্রামের আবি আবদুল্লাহর ছেলে আল আমিন। বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড শেষে তারা জেলা কারাগারে রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গেল বছরের অক্টোবরে চট্টগ্রামের বাকলিয়া নতুন ফিশারিঘাটের আড়তদার ইউছুফ মিয়ার কাছ থেকে রামগতির নাসির উদ্দিন তিন লাখ টাকা দাদন নেন। এরপর থেকে নাসির নিয়মিত ওই আড়তে মাছ বিক্রি করতেন। পরে অভাব-অনটনে পড়ে তিনি একই ঘাটের অন্য আড়তদারের কাছ থেকে দাদন নেন। এতে ইউছুফ ক্ষিপ্ত হয়ে চলতি বছরের ১২ মে ট্রলারসহ নাসিরকে ঘাট এলাকায় আটকে রাখেন। কিন্তু কৌশলে ট্রলার নিয়ে নাসির পালিয়ে রামগতি চলে আসেন। এনিয়ে নাসিরকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। তাকে হত্যা করার জন্য এক লাখ টাকায় রাসেল, সুমন, সোহাগ ও আল আমিনের সঙ্গে চুক্তি করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে ১৬ মে চুক্তিকারী ওই চারজন রামগতির স্লুইস গেট বাজারের একটি দোকান থেকে ১০টি ঘুমের ট্যাবলেট কিনেন। পরদিন নাসিরসহ চার জেলে ও তারা মেঘনায় মাছ শিকারে যান। নদীতে মাছ কম ধরা পড়ার অজুহাতে নাসিরকে ফুসলিয়ে তারা (চুক্তিকারী) বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় নিয়ে যান। ২০ মে সেখানেই ইউসুফের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে পরিকল্পনা অনুযায়ী চায়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মেশানো হয়। পরে ঘুমের ওষুধ মেশানো চা খাওয়ানো হয় নাসির, রিয়াজ, করিম ও মিরাজকে। চা পান করে ঘুমিয়ে পড়লে নাসিরসহ চার জেলেকে সাগরে ফেলে হত্যা করা হয়। পরে ফিশারিঘাট এলাকায় ট্রলার নিয়ে ইউছুফের কাছে হস্তান্তর করেন।

আল আমিন রামগতি ফিরে এসে ট্রলারে জলদস্যুরা হামলা করেছে বলে প্রচার করেন। তারা পালিয়ে এসেছেন বলে বলে মানুষকে জানান। এ খবরে ২৭ মে নাসিরের স্ত্রী মীরজাহান বেগম রামগতি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

১৩ জুন মীরজাহানের মোবাইল ফোনে হত্যাকারী রাসেল করে। এসময় নাসিরসহ চার জেলে তার (রাসেল) হেফাজতে রয়েছে বলে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। ঘটনাটি মীরজাহান পুলিশকে জানালে সেটি ঘটনাটি বড়খেরি নৌ-পুলিশকে তদন্তের জন্য দেয়া হয়। এরপর ১৫ জুন মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে যশোরের চৌগাছা থেকে রাসেলকে আটক করা হয়। পরে তার তথ্যমতে কমলনগরের হাজিরহাট থেকে আল আমিন ও হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী আড়তদার ইউছুফকে চট্টগ্রামের বাকলিয়া থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে তাদেরকে আদালতে সৌপর্দ করে রিমান্ড চায় পুলিশ। এতে ইউসুফের সাত, রাসেল ও আল-আমিনের পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

মামলা বাদী মীরজাহান বেগম বলেন, ‘পেটের দায়ে আমার স্বামী ও ছেলে অন্যদের সঙ্গে নদীতে গেছে। পরিকল্পিতভাবে তাদের চারজনকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশের তদন্তে হত্যার রহস্য উদঘাটন হয়েছে। আমি হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।’

মন্তব্য লিখুন :