তৃতীয় বিশ্বের শিক্ষা মাধ্যম প্রস্তুতে রোল মডেল ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

২০১৯ সালের মার্চ মাসে করোনা প্রাদুর্ভাবে বিশ্ব যখন হকচকিয়ে যায়, স্থবির হয়ে যায় পৃথিবীর কর্মযজ্ঞের স্বাভাবিক গতি; তখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে আসে বর্তমান বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যগত বিষয়াদি চিন্তা করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হলেও, একই সাথে তাদের ভবিষ্যত নিয়ে আশংকা প্রকাশ করে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে, সব কিছু ছাপিয়ে অনলাইন বা ডিজিটাল শিক্ষা মাধ্যম কিংবা তৃতীয় বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তির শিক্ষা মাধ্যমে এখন বিশ্বের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে খুলেছে সম্ভাবনার নতুন দ্বার, রাষ্ট্রীয় অভিভাবকরা ফেলছেন স্বস্তির নিশ্বাস। তবে, উন্নত বিশ্বে শিক্ষা মাধ্যমের ডিজিটালাইজেশন বা আধুনিকীকরণের প্রয়োগ চূড়ান্ত ভাবে সম্ভব হলেও দক্ষিণ-এশিয়ার দেশগুলো এখনো এই শিক্ষা পদ্ধতির সাথে মানিয়ে নিতে বেগ পেতে হচ্ছে। এই সমস্যা, সম্ভাবনা আর সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা করতে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আয়োজনে একটি ভার্চুয়াল সেশন হয় ৪ ফেব্রুয়ারি, যেখান দক্ষিণ-এশিয়ার ৫টি দেশের শিক্ষায়তনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও অধ্যাপক বৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

'করোনা পরিস্থিতির পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার রুপান্তরে দক্ষিণ-এশিয়ার মডেল'- শিরোনামে শুক্রবার সন্ধ্যায় এই ওয়েবিনারে অংশ নেয় বাংলাদেশ সরকারে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের এ টু আই প্রোগ্রামের উপদেষ্টা আনির চৌধুরি, ভারত সরকারের প্রযুক্তি ও আইটি মন্ত্রণালয়ের 'মাইগভ' প্রোগ্রামের পরিচালক শুভ সেন গুপ্ত, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক বিশ্বজিত চন্দ্র, ভূটানের রয়্যাল থিম্পু কলেজে'র একাডেমিক এ্যাফেয়ার্সের ডীন অধ্যাপক শিভারাজ ভট্টারায়, নেপালের কাঠমুন্ডু ইউনিভার্সিটি'র স্কুল অফ এডুকেশনের ডীন অধ্যাপক বালচন্দ্র লুইতেল, শ্রীলংকার শুভারাগামুভা ইউনিভার্সিটি'র টুরিজম ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ম. স ম আসলাম, বাংলাদেশের ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি'র উপদেষ্টা অধ্যাপক উজ্জ্বল কুমার চৌধুরি। সেশনটির আহ্বায়ক ছিলেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি'র ব্লেন্ডেড লার্ণিং সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক মো. আক্তারুজ্জামান এবং পরিচালনা করেন অধ্যাপক উজ্জ্বল কুমার চৌধুরি।

দুই পর্বের এই সেশনে প্রথমে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়, যেখানে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ব্লেন্ডেড লার্ণিং সিস্টেমের প্রশংসা করেন আলোচকরা। তবে, সব বিশ্ববিদ্যালয় একযোগে ডিজিটাল শিক্ষা মাধ্যমের প্রস্তুতি না থাকায় প্রাথমিক অবস্থায় শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক বিশ্বজিত চন্দ্র। বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গুছিয়ে নিতে সময় লেগেছে, যেখানে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি'র ও বেশ কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আগে থেকেই প্রস্তুতি থাকায় চাপ সামলে নিতে পড়েছে। এখন, সকল বিশ্ববিদ্যালয়ই ব্লেন্ডেড লার্ণিং বা অনলাইন-অফলাইন মিশ্র শিক্ষা মাধ্যমের যথাযথ নির্দেশনাবলী ও ব্যবস্থা গ্রহণ হয়েছে বলে তিনি জানান।

এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি সহযোগিতায় সবচাইতে সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট ডাটা, ডিভাইস, শিক্ষকদের জন্য বিভিন্ন ডাটা, প্লাটফর্মের সুবিধা প্রদান করে একটি অনলাইন শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের তুলনায় প্রযুক্তিগত দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের 'মাইগভ' প্লাটফর্মের পরিচালক শুভ সেনগুপ্ত মনে করেন- আমাদের দক্ষিণ-এশিয়ার দেশগুলোর প্রধান সমস্যা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সামর্থবান হতে না পারা। এজন্য অনলাইন শিক্ষা মাধ্যম আমাদের সকল স্তরের শিক্ষার্থীদের উপরে সমান প্রভাব ফেলছে না। প্রযুক্তির সহজলভ্যতার দিক থেকেও আমাদের বিবেচনার সময় এসেছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। সম্প্রতি ভারত সরকার তার শিক্ষা বাজেট আগের তুলনায় আরো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি করেছে। অনলাইন শিক্ষা মাধ্যমে সকল স্তরের গ্রহণযোগ্যতার জন্য আরো সময় ও যথোপযুক্ত পরিকল্পনা তারা করছেন।

অধ্যাপক মো. আক্তারুজ্জামান ব্লেন্ডেড লার্ণিং সেন্টার সম্পর্কে জানান, বাংলাদেশ সরকার ২০০৮ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা করার পরপরই ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সরকারের এই ঘোষণার সাথে সম্পূর্ণরুপে একাত্মতা প্রকাশ করে শিক্ষা মাধ্যমের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহারে মনোনিবেশ করে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সাল থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবছর উচ্চ শিক্ষায় অধ্যায়নরত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের বিনামূল্যে ল্যাপটপ ডিভাইস বিতরণ করে আসছে। এখন পর্যন্ত ৪০ হাজার শিক্ষার্থী এই ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে ল্যাপটপ পেয়েছে। যার ফল ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি পেয়েছে এই করোনা মহামারির দুঃসময়ে। শিক্ষার্থীদের হাতে ডিভাইস, ইন্টারনেট ব্যবহার করার জন্য ও করোনা জন্য সাময়িকভাবে সকল শিক্ষার্থীদের বিশেষ করোনা বৃত্তিসহ, ব্লেন্ডেড লার্ণিং সেন্টারের ব্যবহারে পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় বাড়িতে বসে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ অন্য যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের চাইতে অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত। 'গো-এডু' প্লাটফর্মও এই প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি অনন্য মাইলফলক।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় সেশনে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-এশিয়ার অন্যান্য দেশে ব্লেন্ডেড লার্ণিং প্রোগ্রামের সফলতা কাজে লাগিয়ে আধুনিক এই শিক্ষা মাধ্যমকে শিক্ষার্থীদের জন্য যতবেশি গ্রহণযোগ্য করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করেন বাংলাদেশ সরকারের এ টু আই প্রোগ্রামের উপদেষ্টা আনির চৌধুরি ও অন্যান্য আলোচকর। আনির চৌধুরি দক্ষিন-এশিয়ার প্রেক্ষাপটে অনলাইন শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য ৫ টি প্রধান বিষয়কে নজরে আনতে বলেছেন। শিক্ষার্থীদের নিজ থেকে শিখতে চাওয়ার অভ্যাস গড়া, শিক্ষামূলক বিষয়বস্তু, মূল্যায়ন, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক অবকাঠামো।

আলোচকরা মনে করেন, করোনা পরবর্তী যে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হতে যাচ্ছে, তার জন্য শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়কেই আগে প্রস্তুতি নিতে হবে যেন শিক্ষার্থী তাদের পড়াশোনায় অনলাইন-অফলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় সহজেই মানিয়ে নিতে পারে। প্রযুক্তিগত এই যুগে তাত্ত্বিক জ্ঞানের তুলনায় শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন বাড়াতে হবে ব্যবহারিক জ্ঞানের প্রতি। শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দিয়েছেন অধিকাংশ আলোচকরা। সিলেবাস, কোর্সের বিষয়াদি এই ব্লেন্ডেড লার্ণিং এর উপযুক্ত কিনা এগুলা ভেবে দেখার সময় এখনই। এছাড়া গতানুগতিক ধারা পরিহার করে, শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে হতে হবে আধুনিক। তৃতীয় বিশ্বের এই শিক্ষা মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রযুক্তির ব্যবহারে অনেক বেশি অগ্রসর হতে হবে যাতে যে কোনো পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আর কখনো বিঘ্ন না ঘটতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নাম বারংবারই প্রশংসায় ভাসে। তাৎক্ষণিকভাবে সমস্যার সমাধানে ও প্রযুক্তিগত পূর্ব প্রস্তুতি থাকায় শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ করে অনলাইন শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টিতে দক্ষিণ-এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে সাধুবাদ পায় এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে, আলোচকরা মনে করেন, একাবিংশ শতাব্দীতে আর প্রতিযোগিতামূলক আচরণের সুযোগ নেই; বরং সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব বজায় রেখে সকলকে একত্রে এই করোনা পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা করে বিশ্বের পরবর্তী প্রজন্মকে একটি প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক বিশ্বের সাথে পরিপূর্ণ ভাবে পরিচয় করিয়ে একটি সুস্থ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

মন্তব্য লিখুন :