চৌহালী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের আমলনামা- ১

চৌহালীতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেরামত ও সংস্কার কাজে প্রধান শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪)এর সাব-কম্পোনেন্ট মেইনটেন্যান্স কার্যক্রম বাস্তবায়নের নিমিত্তে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে নির্বাচিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেরামত (মাইনর ক্যাটাগরি) এর ব্যয় নির্বাহকল্পে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিপরীতে ২ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।

একইভাবে চলতি অর্থ বছরের রাজস্ব বাজেটের আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহ এর ভবন ও স্থাপনা খাতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেরামত, সংস্কার ও অন্যান্য কাজ সম্পাদনের লক্ষ্যে জিওবি বরাদ্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিপরীতে ২ লক্ষ টাকা দেয়া হয়। এ ছাড়াও উক্ত বিদ্যালয়ে শ্লিপের ৭০ হাজার টাকা, রুটিন মেরামতের জন্য ২০ হাজার টাকা ও প্রাক-প্রাথমিকের জন্য ১০ হাজার টাকা সর্বমোট ২ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও প্রধান শিক্ষকগণ ম্যানেজিং কমিটির যোগসাজশে নাম মাত্র কাজ করে বাকি অর্থ ভাগাভাগি করে আত্মসাৎ করেছে। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেরামতের কাজ না করে শুধুমাত্র বাইরের ফ্লোর রং করা ও নামমাত্র বিদ্যালয়ের সম্মুখভাগ কোনরকম রং করে মেরামতের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিগত বছরের স্লিপের টাকায় সংস্কার বা মেরামতের কাজ নতুনভাবে দেখিয়ে এবং ভুয়া ভাউচার দাখিল করে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। 

বেশ কিছুদিনের অনুসন্ধানে জানা যায়, সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর ফিরোজের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সময় বদলি, অবসর ভাতা, বকেয়া বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন কাজে ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে থাকে।

তাছাড়াও এ কার্যালয় ঘিরে একটি দালাল চক্র গড়ে উঠেছে যারা নানা কৌশলে শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে, যা উপজেলা শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর ফিরোজ যোগসাজশে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চৌহালী উপজেলায় ১২৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় ৭৫১ জন শিক্ষক ও ৩২ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। অনেক বিদ্যালয় নদী ভাঙনের কবলে পড়ায় অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। 

এ উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক বলেন, চরাঞ্চলে অবকাঠামো-সংকটসহ নানান অসুবিধার মধ্য দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা দালাল চক্রের মাধ্যমে শিক্ষকদের জিম্মি করে রেখেছেন। সেখানে ঘুষ ছাড়া কোনও কাজ হয় না। প্রকল্পের অর্থ উত্তোলনে তিন হাজার করে টাকা দিতে হয়। বিল-ভাউচার পাস করানোর সময় লাগে দেড় হাজার করে টাকা। চলতি বছরের স্কুল মেরামতের স্লিপের করোনাকালীন সময়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা গুলো শিক্ষা কর্মকর্তা ও পুকুরিয়া কোদালিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মশিউর রহমানকে ম্যানেজ করে সুকৌশলে টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে ৷ 

প্রসঙ্গত, উপজেলার ২০ জন পুলভূক্ত শিক্ষক ও ৯০ জন প্যানেল শিক্ষকের যোগদানের সময় প্রত্যেকের কাছ থেকে আড়াই হাজার টাকা ও নতুন বিদ্যালয়ের প্রায় ৫০ জন শিক্ষকের কাছ থেকে টাইমস্কেল ও চলমান প্রাথমিক শিক্ষকদের ১৫ তম গ্রেড থেকে ১৩ তম  গ্রেডে উন্নীতকরণে উপজেলা হিসাব রক্ষণ অফিসের যোগসাজশে দুই থেকে তিন হাজার টাকা শিক্ষকদের  কাছ থেকে নিয়ে কাজ করে দিচ্ছে এমন তথ্য পাওয়া গেছে  ৷ চিকিৎসা ছুটি পাস করাতে প্রত্যেকের কাছ থেকে তিন-পাঁচ হাজার, বিনোদন বিল তুলতে এক হাজার টাকা করে ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। বদলির জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৫-২০ হাজার টাকা এবং পেনশনের টাকা উত্তোলনের কাগজপত্র তৈরিতে ২০-২৫ হাজার টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, অফিস সহকারি ও পুখুরিয়া কোদালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক  মশিউর রহমানের নেতৃত্বে ৬-৮ জনের একটি দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। তারা সব সময় শিক্ষা কার্যালয়ে অবস্থান করে। চাহিদামত ঘুষ না দিলে ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়।

এ বিষয়ে জানতে অফিস সহকারি আতোয়ার রহমানের  সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অফিসের সার্বিক দায়িত্ব উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার। তিনিই সব কিছু করে থাকেন। 

শিক্ষক মশিউর রহমান বলেন, 'বিদ্যালয়ের কাজকর্মের জন্য প্রায়ই শিক্ষা কার্যালয়ে আসতে হয়। অন্য শিক্ষকেরা অনুরোধ করায় তাদের কাজ করে দিই। টাকা-পয়সা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’ 

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার  মাধ্যমে একটি দালাল চক্র গত জানুয়ারিতে ১৯টি নতুন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের চেষ্টা করেছিল। তারা এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠিয়েছিল, যা পরে ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। নতুন বিদ্যালয়ে নিয়োগের কথা বলে অনেকের কাছে টাকা নিয়েছে ওই চক্রটি। 

ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর ফিরোজ বলেন, ‘শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলি রয়েছে। মশিউর একটু বেশি অফিসে ঘোরাঘুরি করেন। তাই অনেকে সহ্য করতে পারে না। চলতি বছরের স্কুলের মেরামতের , করোনাকালীন সময়ের  বাজেট, স্লিপের, ক্ষুদ্র মেরামত সহ সকল ধরনের বাজেট শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর ফিরোজের যোগসাজশে  কাজ না করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে৷  বিদ্যালয়ের  প্রতিষ্ঠান প্রধানগন অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি তিনি শুনেছেন। তবে পুরো বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে কোনও অভিযোগ পাওয়া যায়নি।’ 

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আমিনুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয় কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷

মন্তব্য লিখুন :