রূপের অন্তরালে রানী ক্লিওপেট্রা: দ্বিতীয় খন্ড

২য় খণ্ড

ইতিহাসের পাতায় একটা বিস্ময়কর চরিত্রের নাম হচ্ছে রানী ক্লিওপেট্রা। তিনি মিশরীয় ছিলেন না, ছিলেন গ্রীক। জন্ম মিশরে হলেও তিনি টলেমি রাজবংশের ছিলেন। 

ইতিহাস থেকে জানা যায় তার বাবা টলেমি নিজের বোনকে বিয়ে করে ছিলেন। তাঁদেরই ঔরশজাত সন্তান ছিল ক্লিওপেট্রা। তখনকার দিনে রাজবংশে রক্তের বিশুদ্ধতার জন্য এরকম বিয়ের প্রচলন ছিল।

ক্লিওপেট্রা নিজেও তার ভাইদের কে বিয়ে করেছিলেন। রানী ক্লিওপেট্রার সব থেকে বেশি যেদিকটি নিয়ে আলোচিত হয় সেটি হচ্ছে তার রূপ। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে ক্লিওপেট্রা মোটেই অপরূপ সুন্দরী ছিলেন না। কম্পিউটার ইমেজ করে তার যে চেহারাটা পাওয়া গেছে সেটাকে মোটেই সুন্দরী বলা যাবে না। বরং বলা যেতে পারে একটা অদ্ভুত চেহারা।

তবে এই মানুষটার ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ। তিনি নিজেকে দেবী মনে করতেন এবং যেকোন উপায়েই পুরুষের মনে স্থান করে নিতেন। এছাড়াও তার অসাধারণ মেধা এবং কথা বলতে পারার দক্ষতা তাকে নিয়ে গিয়েছিল ক্ষমতার শীর্ষে। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য তিনি যা যা করা দরকার সবই করেছেন। ক্লিওপেট্রা শুধু একজন রানীই ছিলেন না।

তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী একজন মহিলা। তার সময়ের সেরা জ্ঞানী গুনীদের মধ্যে তিনি অন্যতম। প্রসাধন বিজ্ঞানে তার জ্ঞান ছিল অসাধারণ। এছাড়া তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে ও দক্ষ ছিলেন। রাজনীতির বাইরে তার বেশির ভাগ সময় কাটতো ল্যাবরেটরিতে। তিনি বনজ ওষুধ নিয়ে গবেষণা করতেন।

গ্রীক বাদে আর কোনও ভাষা টলেমি সাম্রাজ্যের প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হতো কিনা তা বলা কঠিন। কিন্তু টলেমি সাম্রাজ্যের রানি ক্লিওপেট্রা তার শাসিত প্রায় সকল রাজ্যের ভাষা জানতেন। তিনি আরব, ইহুদি, পার্সিয়ান, সিরিয়ান, ইথিওপিয়ান, মেদেস, ট্রগোড্রাইটি। এমন অনেক ভাষায় পারদর্শী ছিল।

তিনি ছিলেন টলেমি সাম্রাজ্যের এক মাত্র শাসক, যিনি মিশরীয়দের নিজস্ব ভাষা শিখেছিলেন। তার আগে টলেমী সম্রাজ্যের কোন শাসকই মিশরীয়দের ভাষা, সংস্কৃতি বা ধর্মের প্রতি কোন আগ্রহ দেখায় নি। সে সময় টলেমিদের গ্রিক ভাষাই মিশরের অফিসিয়াল এবং বাণিজ্যিক ভাষায় পরিণত হয়।মিশরীয়দের নিজস্ব ভাষার পাশাপাশি ক্লিওপেট্রা হায়ারেগ্লিফিক ও পড়তে শিখেছিলেন।

ক্লিওপেট্রা নিজেকে একজন মিশরীয় বলে পরিচয় দিতেন। মিশরের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরতেন। মিশরীয়দের ঐতিহ্যবাহী উৎসব  অনুষ্ঠান গুলোতে ও হাজির থাকতেন তিনি। এভাবেই মেসিডোনিয়ান টলেমি বংশের উত্তরসূরি ক্লিওপেট্রা হয়ে উঠে ছিলেন মিশরীয়দের রানি।

মিশরীয়রা তাকে একজন প্রকৃত দেশ প্রেমিক বলে বিশ্বাস করত। বিচক্ষণ ক্লিওপেট্রা বুঝে ছিলেন তিনি যাদের শাসক, তাদেরকে ঠিক মতো বুঝতে ও জানতে হবে, না হলে তিনি তাদের ওপর রাজ করতে পারবেন না। ক্লিওপেট্রার মত এমন প্রজ্ঞা আজকের আধুনিক দুনিয়ার অনেক শাসকের মধ্যে ও থাকে না।

অনেক বিষয়ের মত রসায়নশাস্ত্রে ও খানিকটা পারদর্শিতা ছিল ক্লিওপেট্রার। তিনি বিশ্বাস করতেন, সুগন্ধি শুধু রূপচর্চার উপাদান হিসেবেই নয়, অন্যকে প্ররোচিত করার উপাদান হিসেবে ও খুব কাজের। কথিত আছে, রোমান সেনাপতি মার্ক অ্যান্টনির সাথে প্রথম দেখা করতে যাবার আগে তিনি তার জাহাজের পাল সুগন্ধি দিয়ে ভিজিয়ে ছিলেন, যাতে অ্যান্টোনি তাকে চোখে দেখবার পূর্বেই তার সুগন্ধে অভিভূত হয়ে পড়ে। ক্লিওপেট্রার নিজের একটা সুগন্ধি ফ্যাক্টরি ছিল, যেখানে তিনি নিজেই তৈরি করতেন বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি।

ক্লিওপেট্র্রা সে সময় ত্রয়োদশ টলেমিকে প্রতিহত করতে রোমান সেনাপতি এবং তার প্রেমিক জুলিয়াস সিজারের শরণাপন্ন হন। জুলিয়াস সিজার টলেমিকে ক্লিওটেপট্রার সাথে মিলে রাজ্য শাসন করতে বললে, টলেমি তাতে আপত্তি জানায়। ফলে, জুলিয়াস সিজারের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ত্রয়োদশ টলেমি। শেষ পর্যন্ত, নীল নদের যুদ্ধে জুলিয়াস সিজারের কাছে পরাজিত হয়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলে, নীল নদের জলে ডুবে মারা যায় ত্রয়োদশ টলেমি।

ত্রয়োদশ টলেমির মৃত্যুর পর নিয়ম মেনে, একজন সহ-শাসক পাবার জন্য, আরেক ছোট ভাই চতুর্দশ টলেমিকে বিয়ে করেন ক্লিওপেট্রা। কিন্তু বিয়ের কিছু দিন পর তাকে ও বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন তিনি। ক্লিওপেট্রার এক ছোট বোন ছিল, আরসিনো। বিদ্রোহের সময় ভাইদের পক্ষ নেওয়ায় তাকে ও হত্যার আদেশ দেন ক্লিওপেট্রা। পরিবারে প্রতিদ্বন্দ্বী আর কেউ না থাকলে, নিজেকে মিশরের রানি বলে ঘোষণা করেন ক্লিওপেট্রা। মিশরে আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয় রানি ক্লিওপেট্রার শাসনামল।

মিশরকে রোমানদের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে রোমান শাসকদের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করেন চতুর ক্লিওপেট্রা। রোমান সেনাপতি ও একনায়ক জুলিয়াস সিজার ও মার্ক অ্যান্টনি দু'জনের সাথেই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন ক্লিওপেট্রার। এই প্রেম আর পরিণয় নিয়ে অনেক ধরণের গল্প-কথা প্রচলিত রয়েছে ইতিহাস আর মানুষের কল্পনায়।

ক্লিওপেট্রার দু'জন প্রেমিকই ছিলেন রোমান সেনাপতি, দুজনই ছিলেন বিবাহিত এবং দুজনই ক্লিওপেট্রার প্রেমে পাগল ছিলেন। খ্রিস্ট পূর্ব ৪৮ অব্দে সম্রাট জুলিয়াস সিজার যখন আলেকজান্দ্রিয়া আক্রমণ করে বসেন তখন ক্লিওপেট্রা নিজেকে রক্ষা করতে তার সাথে একটা অভিনব উপায়ে দেখা করার পরিকল্পনা করেন।

নিজেকে কার্পেটে মুড়ে স্বল্প বসন পরে ক্লিওপেট্রা জুলিয়াস সিজারের সামনে উপস্থিত হন। তার ব্যক্তিত্ব দেখে সিজার পটে যান। শোনা যায়, ক্লিওপেট্রার প্রেমে পাগল জুলিয়াস সিজার রোমের ভেনাসের মন্দিরের সদর দরজায় দুজনের মূর্তি স্থাপন করেছিলেন- দেবতা রুপী জুলিয়াস সিজার এবং দেবী রুপী ক্লিওপেট্রার।

রাজনৈতিক জীবনে তার প্রথম প্রেমিক ছিল এই জুলিয়াস সিজারই। প্রায় সময়ই তিনি সিজারের রাজ প্রাসাদে যেতেন। তাকে খুশি করতেন। বিনিময়ে সিজার তাকে দিতেন নিরাপত্তা। তিনি হয়েছিলেন সিজারের স্ত্রী। সেই ঘরে তার একটি সন্তান জন্ম নেয়।

সিজারের মৃত্যুর পর তার সম্পর্কটা তৈরি হয় রোমান জেনারেল মার্ক এন্টোনির সাথে। যদিও সম্পর্কটা ছিল রাজনৈতিক তথাপি অনেকেই মনে করেন এন্টোনিকে , ক্লিওপেট্রা মনে থেকেই ভালোবাসতেন। সেই ঘরে তার ৩ সন্তানের জন্ম হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে তারা প্রমোদ ভ্রমণে যেতেন। মার্ক অ্যান্টোনিও তো ছিলেন পাগলামিতে আরও একধাপ উপরে।

তিনি আস্ত একটা যুদ্ধের অভিযানই বাতিল করেছিলেন ক্লিওপেট্রার সাথে সময় কাটাবার অভিপ্রায়ে। রোমান জেনারেল মার্ক এন্টোনি যখন অক্টোভিয়ানের আক্রমণে মারা গেলেন তখন ক্লিওপেট্রা এন্টোনির মাথাটা নিজ উরুতে রেখে খুব কেঁদে ছিলেন যেটা তার সাইকোপ্যাথিক আচরণের সাথে একদমই যায় না। কে জানে হয়তো সত্যিই ভালোবেসে ছিলেন তাঁকে।

ক্লিওপেট্রা তার প্রজাদের প্রায় বিশ্বাস করিয়ে ফেলে ছিলেন যে, তিনি দেবী আইসিসের পূণর্জন্ম। প্রাচীন কালের বেশির ভাগ শাসকরাই নিজেদের দেবতুল্য মনে করত, ক্লিওপেট্রা ও ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি প্রজাদের মধ্যে অনুগত্য স্থাপন করার জন্য, তাদের মধ্যে প্রচার করতেন, তিনি দেবী আইসিসের পূণর্জন্ম। এবং তিনি একাজে প্রায় সফল হয়ে ছিলেন। মিশরীয়রা অনেকেই তাকে দেবী আইসিসের পূণর্জন্ম বলে সে সময়  বিশ্বাস করত।

ক্লিওপেট্রা নিজেকে 'নতুন আইসিস' বলে দাবী করতেন। তিনি বলতেন, পৃথিবীতে দেবী আইসিসের পূণর্জন্ম রূপে তার আবির্ভাব ঘটেছে। পুরাণে, আইসিস তার ভাই ও সিরিসকে বিয়ে করেছিল এমনটা বলা আছে। একারণে, শুধু যে ক্লিওপেট্রা দেবী আইসিস এর নাম নিয়ে ছিলেন তাই নয়, তার প্রেমিক মার্ক অ্যান্টোনি ও নিজেকে দেবতা ওরিসিস এর পূনঃ আবির্ভাব বলে দাবি করত।

ক্লিওপেট্রা নিজেও যে নিজেকে আইসিস বলে বিশ্বাস করতেন, তা কিন্তু নয়। তার যখন যে দেবীর মূর্তি মনে ধরত, তিনি নিজেকে তেমন করে সাজাতে চাইতেন। যেমন, সুগন্ধি যুক্ত রণতরীতে করে তিনি যখন প্রথম মার্ক অ্যান্টেনি'র সাথে সাক্ষাত করতে যায়, তখন তিনি গ্রীক দেবী ভেনাসের পোশাকে নিজেকে সাজিয়ে ছিলেন। এত আয়োজনের পরেও কি মার্ক অ্যান্টোনি'র ক্লিওপেট্রার প্রেমে পাগল না হয়ে উপায় ছিল!

নিজের ভাইবোনদের হত্যা করেছিল এ অপরাধ যদি বাদ দেওয়া যায়, মিশরের শাসক হিসেবে ক্লিওপেট্রা খুব একটা খারাপ ছিলনা। তিনি মিশরকে একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। দুঃখের ব্যাপার হলো' ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর সাথে সাথেই, তার স্বাধীন মিশরের স্বপ্নের ও মৃত্যু ঘটে।

ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর পরে অনেক বছর, তার যত গুণাবলী আর বিচক্ষণতা ছিল সে সবের কথা শুধু মিশরীয়রাই মনে রেখেছিল। রোমানরা তার সম্পর্কে নানা ধরণের কুৎসা রটিয়েছিল।

তারা তাকে একটা নষ্ট আর ডাইনি নারীর খেতাব এনে দিয়েছিল, যে নারী ক্ষমতাশালী পুরুষদের নিজের জাদুর মায়া জালে বন্দি করত এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করত নিজের সুরক্ষার জন্য। ক্লিওপেট্রার পতনের কয়েকশ বছর পরেও রোমান কবিরা তাকে 'মিশরের লজ্জা' বা 'রোমের অভিশাপ' বলে অভিহিত করত।

মন্তব্য লিখুন :