ত্রিভুজের শহর মিশর

নীল নদের দেশ, পিরামিডের দেশ, মমির দেশ যাই বলি না কেন সবই  হলো  মিশর। মিশর বা EGYPT এর কথা বললে আমাদের মনে যে ছবি গুলো ভেসে উঠে তা হলো তাদের রাজা বাদশা দের মমি আর আকাশ পানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের পিরামিড গুলো। পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি হল এই  পিরামিড। এই পিরামিডকে কেন এবং কিভাবে তৈরি করা হয়েছে এটি আজও ইতিহাসের সবথেকে বড় রহস্য। প্রাচীন মিশর শাসন করতেন ফারাও রাজারা। তাদের কবরের উপর নির্মিত সমাধি মন্দিরগুলোই পিরামিড হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে মিসরের নীল নদের তীরে গড়ে উঠেছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম সমৃদ্ধ এক সভ্যতা, যাদের হাতে তৈরি হয়েছিল আধুনিক যুগের বিস্ময় পিরামিড। প্রাচীন সভ্যতার সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম মিসরের পিরামিডগুলো। পাঁচ হাজার বছর পরও এর রহস্য অনাবৃত। তাই একে ঘিরে মানুষের কৌতূহলেরও যেন শেষ নেই। কালের সাক্ষী হয়ে পিরামিডগুলো টিকে আছে যুগ যুগ ধরে।


পিরামিড
পিরামিড হলো এক প্রকার জ্যামিতিক আকৃতি, যার বাইরের তলগুলো ত্রিভুজাকার, যা একটি শীর্ষবিন্দুতে মিলিত হয়। পিরামিড একটি বহুভুজাকৃতি ভূমির ওপর অবস্থিত। বহুভুজের ওপর অবস্থিত যে ঘনবস্তুর একটি শীর্ষবিন্দু থাকে এবং যার পার্শ্বতল গুলোর প্রতিটি ত্রিভুজাকার।

পিরামিডের গঠনশৈলী অত্যন্ত রহস্যজনক  । আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার  হাজার বছর আগেকার মানুষের তুলনায় অস্বাভাবিক রকম বড় পাথরগুলো কিভাবে এত উপরে তোলা হয়েছিল, আধুনিক যুগের মানুষের কাছে এটা খুব বড় একটা রহস্য। সাধারণ রাস্তার উপর দিয়ে কোনো গাড়ি বা যন্ত্র ছাড়া এত বড় পাথর টেনে আনা কি পরিমাণ  অসাধ্য কাজ  তা আমরা সবাই কল্পনা করতে পারি। কিন্তু মিসরের মরুভূমির বালুর উপর দিয়ে এত বড় পাথর টেনে আনা কত অসাধ্য তা আমাদের কল্পনার বাইরে। আমরা যখন  বালির উপর দিয়ে সাইকেল চালাই তখন দেখতে পাই বালি কিভাবে তার উপর দিয়ে চলমান বস্তুকে টেনে ধরে। তখনকার সময়ে মিসরে এমন কোনো প্রযুক্তি ছিল না যার দ্বার তারা এ বিশাল বিশাল স্থাপনাগুলো তৈরি করতে পারে। আর এ কারণেই এখনো অপার  রহস্যের নাম হচ্ছে পিরামিড।


পিরামিড নির্মাণের কারণ

প্রাচীন মিসরীয়দের ধর্মবিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পুনর্জন্মে বিশ্বাস। তারা বিশ্বাস করত, মৃত্যু পরবর্তী জগতেও প্রয়োজন হবে ধন, দৌলত ও অন্যান্য জাগতিক বিষয়ের। তাই রাজা ও রানিদের মৃত্যুর পর মৃতদেহের সঙ্গে দিয়ে দেওয়া হতো সোনা, রুপা ও মূল্যবান রত্নাদি। তাদের দেহকে মমি বানিয়ে সংরক্ষণ করা হতো এবং তাদের সব দাস-দাসীকে হত্যা করা হতো, যাতে পরকালে তাদের সেবার অভাব না হয়। এই সমাধিসৌধ বা পিরামিডে মৃতদেহগুলোকে সমাহিত করার আগে মমি তৈরি করা হতো। মমি তৈরি করার পেছনে ছিল এক অভিনব পদ্ধতি। মমিগুলো এমনভাবে সংরক্ষণ করা হতো, যাতে সেগুলো পচে-গলে নষ্ট না হয়ে যায়।

যেখানে ধাঁধাঁর শুরু!
বর্তমান যুগের প্রকৌশল আর স্থাপত্য শিল্পে আমরা যা দেখি তা নিতান্তই স্বাভাবিক। কিন্তু পিরামিডীয় যুগে যদি এসবের দেখা পাওয়া যায় তবে সেটা নিতান্তই হবে ভৌতিক! কারণ আধুনিক সভ্যতার প্রযুক্তি তখনকার যুগে থাকার কথা না। যেমন, চাকা। ৯০ টন ওজনের পাথরের ব্লক এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেয়া চাকার সাহায্য ছাড়া খুবই কঠিন। তাঁদের কাছে ক্রেন সদৃশ কোনো যন্ত্র ছিল না, ছিল না লোহার জিনিস মসৃণ করে সূক্ষ্মভাবে তৈরি করার মত প্রযুক্তি।
Khufu, সব থেকে বৃহৎ পিরামিড নির্মিত হয় ২৫৫০ খ্রিষ্টপূর্বে যার উচ্চতা ৪৫০ ফুটেরও বেশি। আর যে সকল পাথরের ব্লক দ্বারা নির্মিত হয়েছে সেগুলোর কথা তো উপরেই বললাম। এবং ৪৫০০ বছরের ঝড়, দুর্যোগ সহ্য করে এখনও টিকে আছে! অথচ এই পিরামিড গুলো এতটা সূক্ষ্মভাবে মাপজোখ নিয়ে নির্মিত হয়েছে, দেখে মনে হবে বর্তমান সময়ের কোনো কারিগর সেখানে সময় পরিভ্রমণ করে গিয়ে তৈরি করে দিয়ে আসছে!

উত্তেজনাপূর্ণ বিতর্কঃ
যেভাবে পিরামিড তৈরি হলো এত বিশাল পাথরগুলো কীভাবে দূর থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল সেটা বের করতে গিয়ে কিছু গবেষক ধারণা করেন হয়তবা আদি মিশরীয়রা ওগুলোকে মরুভূমির মধ্য দিয়ে টেনে নিয়ে এসেছে। যদিও তখন কোনো চাকা বা circular shape এর কোনো বস্তু ছিলনা তাও তাঁরা অনুমান করেছিলেন হয়ত গাছের শাখা কেটে সেগুলোতে রেখে টেনে নিয়ে এসেছে। মোটামুটি ছোটো বা মাঝারি আকৃতির পাথরের ব্লকের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এরকম ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু বড় আকৃতির কিছু পাথরের ক্ষেত্রে এই জিনিসটা একেবারেই অসম্ভব! কিন্তু এই থিওরির আদৌ কোনো প্রমাণ আসলে নেই বা চিত্রকর্ম থেকেও টেনে পাথর নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কোনো হদিস উল্লেখ করা হয়নি যে এ কাজটা এরকমই করা হয়েছিল।

তারপর আসে এত ভারী পাথর নিরবচ্ছিন্ন ভাবে উঁচু হওয়া পিরামিডের উপরে তোলা। প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদরা, যারা জন্মগ্রহণ করেন পিরামিড নির্মাণের শেষে, তাঁরা ভাবতেন মিশরীয়রা এ ক্ষেত্রে ঢালু কোনো তল ব্যবহার করত সিঁড়ির মতো যেটাকে বলা হয় ramp. কিন্তু গবেষকরা দেয়ালের ভেতর অদ্ভুত বাতাসের জন্য ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা দেখে ভাবলেন যদি ramp থাকেও তা ছিল ভেতরের দিকে তাই বাহিরে সেটার অস্তিত্ব প্রমাণের কোনো লক্ষণ ছিলনা।
যাইহোক, দিনশেষে কোনো আইডিয়া বা যুক্তিই সমাধানের আলো দেখা পেল না।


অবশেষে চমকপ্রদ কিছু সমাধান যা কড়া নাড়ে সব বিতর্কে!

হঠাৎই দুটি চমকপ্রদ সম্ভাবনা আলোর দেখা পায়। একটি হচ্ছে, একদল ডাচ গবেষক যখন পুনরায় মিশরীয় চিত্রকর্মের দিকে লক্ষ্য করেন তখন দেখেন শ্রমিকরা স্লেজের মতো করে কিছু টেনে নিচ্ছে এবং সামনে আরেকজন কিছু একটা ঢেলে দিচ্ছে। তাঁরা বুঝতে পারলেন এটা কোনো আচার- ঐতিহ্য নয়, এখানে বালুতে পানি ঢালা হচ্ছে যে পথ দিয়ে পাথর গুলো নিয়ে যাওয়া হবে। ফ্লুইড মেকানিক্সের নীতি অনুযায়ী তরল ঘর্ষণ কমায়। এখানে পানি ঢাললে বালু পিচ্ছিল হবে এবং খুব সহজেই বিশাল পাথরের ব্লক সামনে নিয়ে যাওয়া যাবে। সেই দল এই থিওরির সাপেক্ষে নিজেদের রেপ্লিকা বা মডেল তৈরি করে ব্যাপারটা বাস্তবে প্রয়োগ করল। আর ফলাফল? এই উপায়ে আরো বিশাল পাথরের ব্লক নিয়ে যাওয়া সম্ভব যা হয়ত ইতিহাসবিদ বা প্রত্নতত্ত্ববিদরা চিন্তাও করেন নি।
শুধু তাই নয়, Egyptologist Mark Lehner, যিনি কিনা একজন দক্ষ গবেষক আরেকটি থিওরি উন্মোচন করলেন। এমনিতে পিরামিড কায়রো শহরের মধ্যে বিশাল মরুভূমিতে অবস্থিত। কিন্তু প্রাচীন কালে নীলনদের শাখা উপশাখা শহরজুড়ে বিস্তৃত ছিল। এবং এভাবে কোনো গতিপথ গিয়েছিল পিরামিডের পাশ দিয়ে যেখানে নির্মাণ কাজ চলছিল। হয়ত মিশরীয়রা নৌকাতে করে পাথর গুলো নিয়ে আসা যাওয়া করত এবং সেখানে বন্দর ছিল যেখানে পাথর নৌকা থেকে রাখা হতো। ঠিক যেন পাজলের টুকরো টি জায়গা মত বসল!

এবং আরেকটি রহস্যের উন্মোচনঃ
Mark Lehner এর খনন আরেকটা বিষয়কে আলোকপাত করে, সেটা হচ্ছে দাস শ্রমিকেরা। এরা ছিল প্রচণ্ড দক্ষ কারিগর এবং মমি নির্মাণে সুনিপুণ। তাঁদের প্রচুর পরিমাণে মোহরানা দেয়া হতো। এমনকি পিরামিডের আশেপাশে খনন কালে ১৯৯৯ সালে পাওয়া যায় “পিরামিড সিটি” যেখানে শ্রমিকদের বাসা বাড়ি নির্মাণ করে দেয়া হয়েছিল। পাশে পাওয়া গিয়েছিল একটা কবরস্থান যেখানে কাজে নিহত হওয়া শ্রমিকদের কবর দেয়া হতো। আরেকটি কারণে বুঝা যায় এরা প্রচুর দক্ষ ছিল সেটি হচ্ছে এরা কী পরিমাণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজগুলো করত। কারণ স্বভাবতই আপনি একটি কাজে এক্সপার্ট না হলে সেটি যত সহজই হোক পা বাড়াবেন না কিন্তু তাঁরা ছিল অসম্ভব মাত্রায় সাহসী। কেন এতটা ঝুঁকি নিয়ে কাজগুলো করত সেটাও এখনও রহস্য।…

আজ আমরা জানলাম পিরামিডের তৈরি রহস্যের সমাধানের একটা প্রবল সম্ভাব্য দিক নিয়ে। এই জানার কোনো শেষ নেই। খনন হচ্ছে, আরো হবে এবং একদিন হয়ত পুরো পিরামিডের রহস্যই আমরা উদঘাটন করে জানতে পারব। কে জানি কী চমক লুকিয়ে আছে!

এছাড়াও পিরামিড সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য উল্লেখ করা হলোঃ

১ । পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পিরামিড মিশরে নয় বরং এর অবস্থান হলো  মেক্সিকোতে।
২। মিশরে যে পরিমাণ পিরামিড রয়েছে তার  চেয়েও বেশি পিরামিড রয়েছে সুদানে।
৩। গ্রীক ঐতিহাসিক হিরোডোটাস ক্রীতদাস দিয়ে পিরামিড তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেছিলেন । কিন্তু পরে গবেষণায় দেখা যায় যে,  মিশরের পিরামিডগুলো বেতন ধারী মানুষ দিয়েই তৈরি হয়েছিল। কোন ক্রীতদাস দিয়ে করা হয়নি।
৪। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে  মিশরের পিরামিড তৈরিতে যেসব শ্রমিক কাজ করেছিল তাদেরকে বেতন হিসেবে প্রতি দিন কাজের বিনিময়ে ৪ লিটার বিয়ার দেওয়া হত।
৫। মিশরের পিরামিডগুলোর মাঝখানের অনেক চলাচলের রাস্তা এখনো অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।
৬। পিরামিডগুলোর ভেতরের তাপমাত্রা নির্দিষ্ট এবং এই তাপমাত্রা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রার সমান। (২০ ডিগ্রী সেলসিয়াস)
৭। পিরামিড তৈরিতে যে মর্টার বা চূর্ণ যন্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল সেগুলো ছিল গবেষকদের কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত এবং পাথরগুলোর রাসায়নিক গঠন আর কোনদিন পুনরায় উৎপাদন করা সম্ভব না।
৮। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরাতন  জামা পাওয়া গিয়েছিল মিশরে। এটি ছিল প্রায় ৫ হাজার বছরের পুরানো।
৯। প্রাচীন মিশরীয়রা পাথরের তৈরি বালিশের উপর ঘুমাতো।
১০। মিশরের পিরামিডগুলো তৈরিতে যে পাথরের টুকরোগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল সেগুলোর ভর এবং দৈর্ঘ্যগুলোর সাথে পৃথিবী, সূর্য ও চন্দ্রের দূরত্ব, ভর এবং ব্যাসার্ধের সাথে রয়েছে গভীর আনুপাতিক সম্পর্ক।

মন্তব্য লিখুন :