জৌলুশহীন ঐতিহাসিক ভাদাই মেলা

সিরাজগঞ্জের ঐতিহাসিক ভাদাই মেলাকে ঘিরে এক সময় মানুষ উৎসবের আমেজে মেতে থাকতো। প্রায় ২০-২২ টি গ্রামের জায়গা জুড়ে এই মেলা বিস্তৃত ছিলো। মেলার প্রস্তুতি চলতো এক মাস আগে থেকেই। বর্তমানে, জায়গা সংকটের ফলে ছোট পরিসরে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মানুষের আগমন আগের মতো ঘটে না। জৌলুশপূর্ণ এই মেলা এখন জৌলুশহীন।

সিরাজগঞ্জের জেলার তাড়াশ উপজেলা হতে ১০ কিলোমিটার দূরে ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি সংলগ্ন বারুহাস গ্রামে প্রায় ১৫০ বছর ধরে  চন্দ্র চন্দ্রিমার ১৩ তারিখকে কেন্দ্র করে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। মেলাটি সর্বপ্রথম আয়োজিত হয় সিংড়া-তাড়াশ সীমান্তবর্তী ভদ্রা নদীর পশ্চিমে একটি কালি মন্দিরকে কেন্দ্র করে এবং আয়োজন করেন তৎকালীন বিয়াশ গ্রামের প্রভাবশালী হিন্দু জমিদার। মূলত মেলার দিনে দেবদেবীর পূজার করার লক্ষ্যেই কালি মন্দিরকে কেন্দ্র করে এই মেলা আয়োজন করেন সেই সময়ের হিন্দু জমিদার। 

পরবর্তীতে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন শুরু হলে হিন্দুদের জমিদারি প্রভাব কমতে থাকে এবং মুসলমানদের জমিদারি প্রভাব বিস্তার লাভ করে। ফলপ্রসূতে, তৎকালীন বারুহাস মুসলিম জমিদারের নেতৃত্বে কালি মন্দির হতে মেলা স্থানান্তর করে মুসলিম জমিদার বাড়ি সংলগ্ন ভদ্রাবতী নদীর তীরে বসানোর হয়। 

কয়েক বছরের মধ্যেই মেলার জৌলুশ বৃদ্ধি পেয়ে আকাশচুম্বী হয়। তৎকালীন বারুহাস জমিদার পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় কয়েক বছরের মধ্যেই মেলার সুনাম চলনবিলের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ভদ্রাবতী নদীর তীরে মেলাটি আয়োজিত হত বলে মেলাটির নাম হয়ে উঠে ভাদাই মেলা। ভদ্রাবতীকে স্থানীয় লোকজন ভাদাই নামে চিনত।

ভাদাই মেলার সুনাম এতো বেশি ছড়িয়ে পড়েছিলো যে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, পাবনা, জয়পুরহাট ছাড়াও আরও দূর-দূরান্ত হতে দর্শনার্থীরা এই মেলায়  আসতো। মেলায় আসার লক্ষ্যে বছরের প্রথম দিন থেকেই মাটির ব্যাংকে টাকা জমানো শুরু করতো, সেই সময়ের মেলায় ইচ্ছুক মানুষ। শৌখিন মানুষেরা মেলার রাতে গরু ও মহিষের গাড়ীর বহর নিয়ে আসতো । প্রতিটি বহরে  ৩০-৪০টা  গরু-মহিষের গাড়ী থাকতো। মেলার কেনা কাটা এবং ঘুরাঘুরি শেষ করে মনের আনন্দে তারা বাড়ি ফিরতো।

ভাদাই মেলার আকর্ষণ জুড়ে  ছিলো দেশী প্রজাতির বড় বড় মাছ, হরেক রকম স্বাদের দই ও মিষ্টি, চিনি দিয়ে তৈরি হাতি ঘোড়া আকৃতির সাঁঝ, কাঠ এবং ফার্নিচারের মনোমুগ্ধকর সামগ্রী, বিভিন্ন ধরন এবং আকার-আকৃতির ঘুড়ি,রঙিন ও সাদা রঙের ঝুড়ি, তরতাজা দেশী গরু-মহিষ ও খাসির মাংস, বিভিন্ন ধরনের খেলনা,বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি নানান রঙের শীতল পাটি এবং হস্ত শিল্পের বিভিন্ন  পণ্য। 

এই মেলার সবচাইতে বড় আকর্ষণ ছিলো ঝুড়ি উৎসব। চৈত্র মাসে মেলার আগমন উপলক্ষে মাঘ-ফাল্গুন মাসে শুরু হয়ে যেতো ঝুড়ি তৈরির মহা উৎসব। শীতকালের পিঠা উৎসবের মতোই পালাক্রমে বাড়ি বাড়ি চলত ঝুড়ি তৈরির ধুম। পাড়ার সকল বয়সী মেয়েরা দল বেঁধে ঝুড়ি তৈরির কাজে অংশগ্রহণ করতো। ঢেঁকিতে আটা ভাঙ্গিয়ে চুলোয় সিদ্ধ, তারপর এই নরম আটা ছিদ্র পাতিলে হালকা চাপে তৈরি করা হতো ঝুড়ি। ঝুড়ি তৈরির অসংখ্য ছিদ্রের এই পাতিলকে বলা হতো ঝাঁজর পাতিল।

সাদা ঝুড়ির পাশাপাশি আটার সঙ্গে হলুদ মিশিয়ে তৈরি করা হতো রঙিন ঝুড়ি। আবার ঝাল মিশিয়ে তৈরি করা হতো ঝাল ঝুড়ি। এভাবে চিকন ঝুড়ি, মোটা ঝুড়ি ছাড়াও হরেক রকম মুখরোচক ঝুড়ি তৈরি করা হতো। মেলায় আসা অতিথি এবং  জামাইদের  আপ্যায়ন করা হতো এই ঝুড়ি দিয়ে। ঝুড়ি ছাড়া  জামাই আদরের কথা ছিলো ভাবনাহীন। 

কালের বিবর্তনে ভাদাই মেলা বর্তমানে বারুহাস গ্রামের নামানুসারে বারুহাস মেলায় পরিণত হয়েছে। সেই সাথে জৌলুশপূর্ণ এই মেলা পরিণত হয়েছে জৌলুশবিহীন। ঐতিহাসিক এই মেলা আয়োজনের জন্যে বর্তমানে নির্ধারিত কোনও জায়গা নেই। অতীতে বারুহাস জমিদার বাড়ি সংলগ্ন ভদ্রাবতী নদীর পাড়ে এই মেলা আয়োজিত হলেও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এখন আর এই স্থানে মেলা আয়োজিত হয় না। এখন মেলা বসে রাস্তার দু-ধার ঘেঁষে ও স্কুল মাঠে। জায়গা সংকটের কারণে প্রতিবছর মেলায় আসা দর্শনার্থী এবং ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগে পড়েন। 

তাছাড়াও মেলাতে আর আগের মতো দেখা মেলে না গরুর গাড়ির বহর, হস্তশিল্পের সামগ্রী,রঙিন ও সাদা ঝুড়ি,শীতল পাটি, যাত্রাপালা, সার্কাস, ভেলকিবাজি এবং ঘোড়দৌড়। সবচেয়ে বেশি দেখা মেলে না মানুষের আগের মতো সেই আগমন। 

১৫০ বছরের এই ভাদাই মেলাকে কেন্দ্র করে ঘিরে থাকা বাঙালির লোকজ সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে।


লেখক-সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি 

মন্তব্য লিখুন :