নিস্তব্ধ শূন্যতার জালে আবদ্ধ মন চায় একটু মুক্তির স্বাদ

লেখক

মানুষ সামাজিক জীব। বিভিন্ন প্রয়োজনে একজন মানুষ, আরেকজন মানুষের উপর নির্ভরশীল। পারস্পারিক নির্ভরতার বন্ধনকে কোন মানুষই ভাঙতে পারেনা। এই সামাজিক বন্ধন মানুষের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা অবধি বিদ্যমান থাকে।  মহামারী, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো ইত্যাদি মানুষের সামাজিক বন্ধনের অন্তরায়।

মহামারী রোগে আক্রান্ত পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটে। এসময় সামাজিক বন্ধনের  অবক্ষয় হয়। রোগ, ব্যাধি কিংবা মহামারীর ইতিহাস নতুন কিছু নয়। অনেক আগে থেকেই মহামারী পৃথিবীতে হানা দিয়ে আসছে।  ১০ হাজার বছর আগে শিকার নির্ভর জীবনযাত্রা থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ যখন সমাজবদ্ধ হয়ে কৃষি কাজ শুরু করে তখন থেকেই মহামারীর সূচনা। গুটি বসন্ত, কলেরা, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, কুষ্ঠ রোগ, প্লেগ, ইনফ্লুয়েঞ্জা  ইত্যাদি ওই সময় থেকেই বিস্তার লাভ করে।  

প্রতি ১০০ বছর পরপর কাকতালীয় হলেও সত্যি এই পৃথিবীতে মহামারীর আগমন ঘটে। ১৭২০ সালে ইউরোপে সর্ববৃহৎ আকারের প্লেগ মহামারী দেখা দিয়েছিল, যা পরিচিত 'গ্রেট প্লেগ অব মার্সেই' বলে। প্রকৃতপক্ষে প্লেগ মহামারী ইউরোপে প্রথম আঘাত করেছিল ১৩৩১ সালে। তারপর থেকে মাঝে মাঝেই প্লেগ ফিরে এলেও ১৭২০ সালেই এই রোগ সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের এখনকার লেবানন দেশ থেকে এক বাণিজ্যিক জাহাজের মাধ্যমে প্লেগ-এর ব্যাকটেরিয়া পারি দিয়েছিল ইউরোপে। প্রথমে জাহাজের এক তুর্কি যাত্রী আক্রান্ত হন এবং দ্রুতই মারা যান। তারপর আক্রান্ত হন জাহাজটির বেশ কয়েকজন ক্রু সদস্য এবং ডাক্তার। বেশ কয়েকটি বন্দর জাহাজটিকে প্রবেশ করতে না দিলেও মার্সেইতে তাকে নোঙর ফেলতে দেওয়া হয়। জাহাজের প্রত্যেককে বিচ্ছিন্নতায় রেখেও মহামারীকে আটকানো যায়নি। মার্সেই-এ সেই বছর প্রায় ১,০০,০০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। 

১৮২০ সালে সারা বিশ্বে কলেরা শুরু হয়। এটি অতি মহামারি আকার ধারণ করে ১৮১৭ সালে। ১৮২৪ সাল পর্যন্ত এর প্রভাব থাকলেও ১৮২০ সালে তা সর্বোচ্চ আকার ধারণ করে।১২০ সালে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কলেরায় আক্রান্ত এলাকার দৃশ্য ছিল একেবারেই ভিন্ন। এশিয়াটিক কলেরা নামে পরিচিত এই অতি মহামারি শুরু হয় কলকাতার ব্রিটিশ সেনাদের মধ্যে। পরে তা প্রায় অর্ধেক বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এই মহামারিতে কত লাখ লোক মারা গিয়েছিলেন তা পরিষ্কার জানা যায়নি। তবে পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ব্যাংককেই মারা গিয়েছিল প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। 

বিশ্বের ইতিহাসে এককভাবে সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রাণ নিয়েছে স্প্যানিশ ফ্লু।  ১৯১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯২০-র ডিসেম্বর পর্যন্ত চলেছিল স্প্যানিশ ফ্লু। সেই সময় চলছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। আর তার জন্য ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশের নেতারাই এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ও রোগের তীব্রতা রেখে ঢেকে জানিয়েছিলেন। এই ঢাকা-চাপাতেই আরও মারাত্মক আকার নেয় এই মহামারী। স্প্যানিশ ফ্লু নামে পরিচিত হলেও ঠিক কোন দেশ থেকে এই রোগের উৎপত্তি ঘটেছিল তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে এই ফ্লু-তে স্পেনীয় রাজা আলফোনসো-ও আক্রান্ত হওয়া থেকেই এই নাম জনপ্রিয়তা পায়। এইচ১এন১ ফ্লু ভাইরাস-এর একটির জিনগত পরিবর্তনের ফলেই ভাইরাসটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫০ কোটি মানুষের দেহে এই ভাইরাসের সংক্রামণ ঘটেছিল। যা ছিল সেই সময়ের বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ। আর মৃত্যু হয়েছিল আনুমানিক ১ কোটি ৭০ লক্ষ থেকে ৫ কোটি মানুষের। অনেকে মনে করেন সংখ্যাটা ১০ কোটিও হতে পারে। এখনও পর্যন্ত এটাই বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক মহামারী।

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহান শহরের করোনা ভাইরাস এর একটি প্রজাতির সংক্রমণ দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভাইরাসটিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ২০১৯-এনসিওভি নামকরণ করে। করোনা ভাইরাস নামটির উৎপত্তি লাতিন শব্দ করোনা থেকে যার অর্থ “মুকুট” বা “হার”। হাঁচি ও কাশির মাধ্যমে সৃষ্ট পানিকণার আক্রান্তের সংস্পর্শে অন্য ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে। এ যাবত পৃথিবীতে যত মহামারী এসেছে তার মধ্যে করোনা ভাইরাসই সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়েছে। এরই মধ্যে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ১৩কোটির অধিক এবং মৃত্যুর সংখ্যা ২৮ লক্ষের অধিক। 

আইইডিসিআরের সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেছেন, “ স্প্যানিশ ফ্লু যখন প্রাদুর্ভাব ঘটে তখন মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না।  সে কারণে রোগ ছড়াতে একটু সময় লেগেছিল।  বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত বলে কোভিড-১৯ ছড়িয়েছে দ্রুত ।”

করোনা ভাইরাস  মহামারী বছর পার করলেও জীবাণুটি এখনও দুর্বল হয়নি  জানিয়ে ক্যামব্রিজের পিএইচডি ডিগ্রীধারী এই গবেষক বলেন, “ভাইরাস থেকে যেসব রোগ মহামারী আকারে ছড়ায় সেগুলো বিভিন্ন কারণে এক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে করোনাভাইরাস দুর্বল হয়েছে এমন কোন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।”  

বর্তমান উন্নত মেডিকেল সাইন্সের আশীর্বাদে কিছু টিকা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। একটা ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে অনেক রিসার্চের প্রয়োজন পড়ে এবং অনেক সময় লেগে যায় কিন্তু ২০২০ সালে বৈজ্ঞানিকরা নিরাপদ ও কার্যকরী করোনা ভাইরাস ভ্যাকসিন রেকর্ড পরিমাণ সময়ের মধ্যে উদ্ভাবন করেন। বর্তমানে ৮৬টি ভ্যাকসিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্যে আছে যায় মধ্যে ২৩ টা চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত সকল মানুষ ভ্যাকসিনের আওতায় না আসছে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা কেউ নিরাপদ নয়। তাই এই সময় গুলোতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা ভালভাবে মেনে চলতে হবে। যেমনঃ বার বার সাবান পানি দিয়ে হাত ধোঁয়া,  হাঁচি, কাশি দেওয়া লোকজন থেকে দূরত্ব বজায় রাখা, বাইরে গেলে অবশ্যই মাস্ক পরিধান করা, চোখ, নাক, মুখে স্পর্শ না করা ইত্যাদি। সর্বোপরি, এই অমোঘ অন্ধকারে ঘোর কেটে কবে সূর্যের আলো দেখা দিবে, এটাই মানবজাতির প্রতিক্ষা, মানবজাতির মুক্তি।

লেখকঃ মনোবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য লিখুন :