ঠান্ডা মাথার অধিনায়কত্বের ম্যাজিশিয়ান যিনি!

২০০৭ সাল। দক্ষিণ আফ্রিকায় চলছে ভারত বনাম পাকিস্তান আইসিসি টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের শেষ ওভার। পাকিস্তানের জয়ের জন্য ৬ বলে ১৩ রান দরকার, হাতে মাত্র এক উইকেট।

উইকেটে আছেন ৩৭ রান করা অভিজ্ঞ পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান মিসবাহ-উল-হক। উইকেটের পিছনে থাকা তরুণ ভারতীয় অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি এই সময় বল করতে বেঁছে নেন অনভিজ্ঞ বোলার জগিন্দার শর্মাকে। এমন উত্তেজনার মুহূর্তে ধোনির এরকম একটি সিদ্ধান্ত যদি ভুল প্রমাণিত হয় তাহলে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হবে তাকে। কিন্তু ধোনির বেঁছে নেওয়া জগিন্দার শর্মা তার ওভারের ৩ য় বলে মিসবাহ কে ক্যাচ আউটের শিকার করে পাকিস্তানকে অল আউট করেন। এরই মাধ্যমে ভারত তাদের প্রথম টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপ শিরোপার ছোঁয়া পায়। সবাই ধোনির স্থির মস্তিষ্কে নেওয়া সঠিক সিদ্ধান্তের পরিচয় পেলেন। 

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ক্রিকেট দলনেতাদের কথা উঠলেই সবাই একনামে চিনবেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির কথা। ক্রিকেটপ্রেমীরা এবং বিশ্লেষকরা যাকে এক কথায় ক্যাপ্টেন কুল নামে চেনেন। তার শীতল মস্তিষ্ক এবং বুদ্ধিদীপ্ত অধিনায়কত্বের দরুন তিনি হয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের সর্বকালের সেরা একজন দলনেতা, এছাড়াও তাকে গোটা ক্রিকেট দুনিয়ার অন্যতম একজন শ্রেষ্ঠ দলনেতা হিসাবে ধরা হয়। কিন্তু এতো দলনেতার মাঝেও ক্রিকেটে কেন ধোনিকে ক্যাপ্টেন কুল বলা হয়? জেনে নেওয়া যাক এর পেছনের কারণসমূহ।  

২০০৭ সালে ভারতের প্রথম টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়, ২০১১ সালে দীর্ঘ ২৭ বছর পর ভারতের ওয়ানডে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়, ২০১৩ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়, এই তিনটি বিশাল অর্জনে যিনি সামনে থেকে দল এবং দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনিই ক্যাপ্টেন কুল মহেন্দ্র সিং ধোনি।

তিনি শুধু একজন দক্ষ দলনেতার ভূমিকাই পালন করেননি বরং নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান হিসাবে দলের হয় রান করেছেন, পাশাপাশি উইকেটের পেছনে একজন উইকেটরক্ষকের ভূমিকাও পালন করেছেন। অনেকেই মনে করেন এমন অনেক খেলা হয়েছে যেগুলোতে ভারতের জয় প্রায় অসম্ভব মনে হতো কিন্তু পরিস্থিতি প্রতিকূলে যেতে থাকলেও ধোনির আত্মবিশ্বাস আর স্থিরতা সেইসব ম্যাচগুলোর মোড় ঘুরিয়ে দিতো। দলের বিপদে স্থির থেকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো ক্ষমতা সকলের থাকেনা। কিন্তু ধোনি ভারতীয় ক্রিকেটকে সম্পূর্ণ একটি নতুন পথ দেখিয়েছেন। তিনি জয়ে কখনো আত্মহারা কিংবা হারে কখনো দিশেহারা হয়ে পড়েননি। 

একটি দলের প্রতিটি খেলোয়াড়ের সমন্বয় করা, তাদের মনোবল অটুট রাখা, উদ্যম বজায় রাখা এসব একটি অসম্ভব ম্যাচকে সম্ভব করে দিতে পারে তা ধোনি প্রমাণ করেছেন বলে মনে করেন তার সারথিরাও। এখন যদি পরিসংখ্যানের কথায় আসা যায় তাহলে দেখা যায়, টেস্ট ফরম্যাটে ভারতের সর্বপ্রথম ১ নাম্বার স্থান অধিকার করা, ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলোর মাঝে একসময়ে তলানির দিকে থাকা ভারতীয় ক্রিকেট দলের ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হয়ে উঠা, এসব গল্পের পেছনে ধোনির অবদান কতোটা বিস্তর! বিদেশের মাটিতে ভারতের পূর্বের সিরিজ জয়ের সামান্য কিছু দৃষ্টান্ত নিয়মিত পূরণ হতে লাগলো তারই নেতৃত্বে। সাফল্যের সাথে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দলনেতা হিসাবে অস্ট্রেলিয়ার রিকি পন্টিং এর পরে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জেতার গৌরবও অর্জন করেন তিনি।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে মহেন্দ্রে সিং ধোনিকে ক্রিকেট অনুরাগীরা খেলার মাঠে কিংবা মাঠের বাহিরে কখনো চটে যেতে কিংবা ক্ষেপে যেতে দেখেননি। বিভিন্ন সময়ে হারের পর কিংবা সাংবাদিকদের জ্বালাময়ী প্রশ্ন শুনেও কখনো তিনি তার শান্ত মেজাজ গরম করেননি বরং হাসিমুখে জবাব দিয়ে সেগুলোর মোকাবিলা করেছেন।

একবার এক সাংবাদিক তাকে অবসরের বিষয় নিয়ে জিজ্ঞাস করার পর তিনি এক কাণ্ড করে বসেন। ম্যাচ শেষে প্রেস কনফারেন্স চলাকালীন অবসর নিয়ে প্রশ্ন করা সে সাংবাদিককে তার পাশের সিটে এসে বসতে বললেন। সাংবাদিক কিছুটা ইতস্তত হলেও ধোনি তাকে পাশে বসিয়ে জিজ্ঞাস করলেন যে, 'আপনার কি মনেহয় আমি উইকেটের মাঝখানে রান নিতে স্লো?’ সাংবাদিক বললেন, 'একদমই না', তারপর ধোনী হাসিমুখে আবার জিজ্ঞাস করলেন, আপনার কি মনেহয় আমার এই গতি নিয়ে আমি পরবর্তী বিশ্বকাপ পর্যন্ত খেলতে পারবোনা?' সাংবাদিক বললেন ‘অবশ্যই পারবেন' ধোনি মুচকি হেসে বললেন, ‘তাহলে আপনি আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছেন।' এরকম ঘটনা ধোনিকে সব মহলেই কুল হিসাবে পরিচিত করে তুলেছে। ক্যাপ্টেন কুল উপাধি এজন্যই তার সাফল্যের মুকুটে গেঁথে দিয়েছেন ক্রিকেট ভক্ত এবং অনুরাগীরা। কিভাবে ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে দলকে নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয় তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত মহেন্দ্র সিং ধোনি। 

মন্তব্য লিখুন :