সত্যিকারেই 'দ্যা কুইনস গ্যাম্বিট'

২০২০ সালের ২৩শে অক্টোবর মুক্তি পাওয়া 'দ্যা কুইন্স গ্যাম্বিট' সম্পর্কে কেই বা ধারণা করেছিল যে, মুক্তি পাওয়ার চার সপ্তাহের মধ্যে এটি নেটফ্লিক্স সিরিজের সর্বোচ্চ দর্শকপ্রিয়তা লাভ করবে। আদতে, স্কট ফ্রাঙ্কের মতো স্ক্রিপ্ট লেখকের লেখা ও পরিচালনা এবং এনা টেইলর-জয় এর অসাধারণ অভিনয় আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো এই মিনি ড্রামা সিরিজের দাবার ফ্রেমে আটকে রাখবে। তাই সর্বশেষ সংস্করণে আইএমডিবি রেটিং এখন ৮.৬ নিয়ে সাম্প্রতিক দর্শকপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছে 'দ্যা কুইন্স গ্যাম্বিট'।

এলিজাবেথ হারমন, যাকে নিয়ে এই সিরিজের সম্পূর্ণ দৃশ্যায়ন, মাত্র নয় বছর বয়সেই গাড়ি দুর্ঘটনায় মাকে হারিয়ে অনাথ আশ্রমে বড় হোন। তবে স্বাভাবিক শিশুর মতো বেড়ে হয়ে উঠা না হলেও, সকল প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই বিশ্বকে নিজের ব্যাপারে জানান দেন বেথ, সেটাও দাবা খেলার মাধ্যমে। অনাথ আশ্রমের মেয়ে শিশুদের জন্য প্রতিদিনের বরাদ্দ করা সবুজ-নীল রঙের বিশেষ ধরনের ঘুমের ওষুধ (ট্রানকুইলাইজার) একসময় বেথ এর অভ্যাসে পরিণত হয়।

আশ্রমের একজন পরিচারক মি.শেইবেল (বিল ক্যাম্প) এর ছোট্ট ঘরে দাবার হাতের খড়ি হওয়া বেথ, নিজের ভেতরেই দাবার জগত তৈরি করতে শেখে সেই সবুজ-নীল রঙের ওষুধের ঘোরে। এর প্রভাব সিরিজের প্রতিটি এপিসোডে বেথের ব্যক্তিগত জীবনের পরিবর্তনের মাধ্যমে ফুটে ওঠে। ১৫ বছর বয়সে হুইটলি পরিবার তাকে দত্তক নিলে, তার বেড়ে হয়ে উঠা হয় এলমা হুইটলির (ম্যারিয়েল হেলার) কাছে। মা হিসেবে নয়, বরং একজন পার্টনার বা সঙ্গী হিসেবেই বেথকে সঙ্গ দিয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন দাবা প্রতিযোগিতায় অনন্য এক মেধার মাধ্যমে পুরস্কার ছিনিয়ে আনতে সাহায্য করেন মিসেস হুইটলি।

তাই এলিজাবেথ হারমন ক্রমশ হয়ে উঠে অপ্রতিরোধ্য, হার মানতে না শেখা এবং নেশার জগতের আসক্ত জেদি এক যুবতী।

স্ক্রিপ্ট লেখক ও নির্দেশক স্কট ফ্রাঙ্কের সাথে সিরিজটি তৈরিতে যুক্ত ছিলেন এলেন স্কট। সেই সাথে এডিটর মিচেল রেসেরো এবং সিনেমাটোগ্রাফার স্টিভেন মিজলার এর সমন্বয়ে ১৯৫০ এর দশক থেকে '৬০ এর দশকের চিত্রায়ন পুঙখানুপুঙখভাবে ফুটে উঠেছে 'দ্যা কুইন্স গ্যাম্বিট'-এ। তবে সব কিছু ছাপিয়ে এনা টেইলর -জয়, তার জাত চিনিয়েছে এই সিরিজে।

তার প্রত্যেকটি ক্যামেরা ফ্রেমে বন্দী করা চোখের চাহনি ও মুখের ভঙ্গিমা, আপনার কপালে ভাজের সৃষ্টি করবে এবং ঠোটের কোনে হাসি তাতে আপনি দাবা খেলা বোঝেন বা না বোঝেন, আপনি পুরো ব্যাপারটা অতি মাত্রায় উপভোগ করতে বাধ্য। এই চিত্রায়ন তৈরিকারক স্কট ফ্রাঙ্ককে হলিউড পাড়ায় এই জন্যই বোধহয় বারংবার কুর্ণিশ করা হয়।

১৯৯৮ এর মুক্তি পাওয়া 'আউট আফ সাইট' কিংবা ২০১৭ এর 'লোগান' এর মতো অসংখ্য ছবির যে চিত্রনাট্য যিনি তৈরি করেছেন, তার কাছে এর চেয়ে কম আশা করি কিভাবে! তার নামের সাথে আর বিশেষ কোনো বিশেষণের প্রয়োজন পড়ে না।

বেথ তার জীবনে অনেক সঙ্গ ও সঙ্গী পেয়েছে, যারা সত্যিকার অর্থেই দাবা বোর্ডের একক রাণী হিসেবে বেথকে কল্পনা করে এসেছে, কিন্তু মিসেস হুইটলির সঙ্গ হারিয়ে বেথের ব্যক্তিগত জীবন যেন দাবা বোর্ড কিংবা ম্যাগাজিনের প্রথম পাতার মলাটের বাইরে টেনে হিচড়ে নিয়ে আসে মাদক, একাকীত্ব আর জীবন নিয়ে প্রচন্ড খামখেয়ালিপণা। তবে সব কিছু ছাপিয়ে তার দাবার জগতের একমাত্র ভয়, একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ভেসিলি বোরগোভকে হারিয়ে বিশ্বের সেরা দাবাড়ুর খেতাব ছিনিয়ে আনার মাঝের দৃশ্যগুলো উপভোগ করতে আপনাকে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে অপলক। আর প্র‍তিটা পদে পদে বিস্ময় আর নেশার মতো এই মিনি সিরিজের টুইস্টগুলো উপভোগ করতে আপনি বাধ্য।

'দ্যা কুইন্স গ্যাম্বিট' মিনি সিরিজটি ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত ওয়াল্টার টেভিসের একই নামে প্রকাশিত উপন্যাস থেকে তৈরি করা হয়। তবে উপন্যাসটি ততদিনে এতোটা সফলতা পায়নি, যেভাবে নেটফ্লিক্সে এই সিরিজটি প্রকাশের পর বিক্রি হচ্ছে। চমৎকার নির্দেশনা, চিত্রনাট্য, মেকআপ, সিনেমাটোগ্রাফি সবকিছুকে ছাপিয়ে, আপনি একক এনা টেইলর-জয়কে দেখতে পাবেন সম্পূর্ণ সিরিজটিতে তার রুপ, মেধা আর বিশেষ চোখের চাহনির মধ্যে দিয়ে, যা কোটি কোটি দর্শককে এক ফ্রেমে চোখ ও মন আটকে ফেলার জন্য যথেষ্ট।

২৫ বছর বয়স্ক এই অভিনেত্রীকে হঠাৎ দেখায় মনে না পড়লেও, মনে ঠিকই না নাড়া দিবে কোথায় দেখেছেন তাকে। হ্যা, এর আগেও বেশ কিছু কাজ হলিউড পাড়ায় করেছেন এনা টেইলর জয়, তার মধ্যে দর্শকের মনে পড়বে তাকে 'পিকি ব্লাইন্ডার্স' সিরিজের কাজের মধ্যে দিয়ে।  'দ্যা কুইন্স গ্যাম্বিট' হলো দাবা বোর্ডের এক বিশেষ ওপেনিং; এনা টেইলর -জয় হলিউড পাড়ার সেই রাণী যে 'দ্যা কুইন্স গ্যাম্বিটের' মাধ্যমেই নতুন এক পরিচয়ে ডানা মেলতে যাচ্ছেন।

আর তার সম্পর্কে সিরিজের শেষ এপিসোডে তাই দাবা খেলার ধারাভাষ্যকার বলেন, "The One Thing We Know About Elizabeth Harmon Is That She Loves To Win." এনা টেইলর -জয় তাই দাবার মোড়কে ঘেরা হলিউডের নতুন কুইন যেন জানান দিয়ে গেল।

মন্তব্য লিখুন :