গাইবান্ধার কৃতিসন্তান তুলসী লাহিড়ী

তুলসী লাহিড়ী (৭ এপ্রিল ১৮৯৭ - ২২ জুন ১৯৫৯ বয়স ৬২ বছর), তার জন্ম অবিভক্ত বাংলার রংপুর জেলা, বর্তমান গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা গ্রামে। তার পিতার নাম সুরেন্দ্রনাথ লাহিড়ী। পিতা ছিলেন রংপুরের ডিমলা এস্টেটের ম্যানেজার। তার জন্ম জমিদার পরিবারে। কিছুকাল জমিদারি এলাকায় কৃষিকর্ম পরিচালন কর্মেও তাঁকে নিয়ােজিত থাকতে হয়।

বিখ্যাত নাট্যকার, অভিনেতা, গ্রামোফোন কোম্পানির সুরকার, বাংলা ছায়াছবির জনপ্রিয় চিত্রনাট্যকার। নাটক রচনা ও অভিনয় দিয়ে নাট্য আন্দোলনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছিলেন।

বাল্যকাল থেকে একদিকে রবীন্দ্র সাহিত্য, অন্যদিকে সঙ্গীতে তাঁর প্রীতি ছিল। এই জন্যই তার নাটকগুলির বিশেষত্ব একদিকে একাধিক গানের প্রোয়ােগ, অন্যদিকে রবীন্দ্র-গান, কবিতার উদ্ধৃতি।

বি.এ. ও বি.এল. পাস করে প্রথমে রংপুরে ও পরে কলকাতার আলিপুর কোর্টে ওকালতি। তার রচিত দুইটি গান জমিরুদ্দিন খাঁ রেকর্ডিং করলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ।কালে হিজ মাস্টার্স ভয়েস ও মেগাফোন গ্রামোফোন কোম্পানিতে সংগীত পরিচালক পদে নিযুক্তি লাভ। শুরু হলো অজস্র গান রচনা আর সুর সংযোজন।

আইন ব্যবসা ত্যাগ করে চলচ্চিত্র ও নাট্যাভিনয়ে যোগদান: একাধারে নাট্যকার, পরিচালক ও গীতিকার তুলসীদাস লাহিড়ী বাংলা নাট্যসাহিত্যে, চলচ্চিত্র ও রঙ্গমঞ্চে এক স্মরণীয় নাম। তার শিক্ষা ও পারিবারিক পটভূমিকা, তার আইনজ্ঞান, কৃষিজীবন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা এবং সেই সঙ্গে যুদ্ধ ও মন্বন্তরের রূঢ় অভিঘাত তার শিল্পী মানসকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করেছিল।

নির্বাক যুগ থেকে শুরু করে বাংলা চলচ্চিত্রের সংগে কয়েক দশকের ঘনিষ্ঠতা ছিলো তার। নাট্যরচনা, মঞ্চাভিনয় এবং পাশাপাশি চিত্রপরিচালক ও অভিনেতারূপে তার অভিজ্ঞতা ছিলো ব্যাপক, সিদ্ধি ছিলো ঈর্ষাজনক।

১৯৩৯ থেকে ১৯৪৭ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত একদিকে বিশ্বযুদ্ধের সর্বগ্রাসী প্রভাব, অন্যদিকে আভ্যন্তরীণ রাষ্ট্র বিপ্লব ভারত তথা বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে নিদারুণ বিপর্যয় ঘনীভূত করে তুলেছিল। ফলে বাংলার নাট্যসাহিত্য এই বিশ্ব রাজনীতি ও দেশীয় বিপর্যয়ের দ্বারা বিপুলভাবে প্রভাবিত হয়েছিল অনিবার্যভাবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, পঞ্চাশের মন্বন্তর ইত্যাদি অভিজ্ঞতার বেদনা ও বিক্ষোভ বাংলা নাট্য আন্দোলনের দিগন্ত-প্রসারী সম্ভাবনার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। বিজন ভট্টাচার্য, দিগিন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, মন্মথ রায়, সলিল সেন, বিধায়ক ভট্টাচার্য ইত্যাদি নাট্যকারগণ এই যুগে বিশেষ মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নাট্যরচনায় ব্রতী হয়েছেন।

এ যুগে নাটক আর মধ্যবিত্তের মনােরঞ্জনের উদ্দেশ্যকে সম্বল করে অগ্রসর হয় নি, নাটক হয়ে উঠেছে জীবন পরিবর্তনের হাতিয়ার। এই নাট্য আন্দোলনেরই অন্যতম শক্তিশালী নাট্যকার তুলসী লাহিড়ী।মার্ক্সের দৃষ্টি নিয়ে নাট্যরচনায় সার্থকতা লাভ। পঞ্চাশের মন্বন্তরের পটভূমিকায় গ্রাম বাংলার দরিদ্র মানুষের অভাব-অনটন দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও তাদের উপর ধর্মীয় ও সামাজিক নিপীড়নের আলেখ্য অবলম্বনে "দুঃখীর ঈমান" (১৯৪৭) ও "ছেঁড়াতার" (১৯৫০) নাটক রচনা করে ব্যাপক সুনাম অর্জন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৩৫০-এর মন্বন্তর, সেই সঙ্গে কৃষক জীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় তুলসী লাহিড়ীকে এক নবতর উপলব্ধি ও প্রত্যয়ের ক্ষেত্রে নিয়ে গেছে। এই অভিজ্ঞতারই রূপায়ণ ঘটল 'দুঃখীর ঈমান' নাটকে। বলা হয় 'দুঃখীর ঈমান' শুধু দুঃখীদের ঈমান নয়, হিন্দু-মুসলিম কৃষকদের প্রতি বাংলার এক অভিজ্ঞ শিল্পীর ঈমান। "মায়ের দাবি" (১৯৪১), "পথিক" (১৯৫১), "লক্ষ্মীপ্রিয়ার সংসার" (১৯৫৯) তার অপরাপর নাটক।

উত্তর বাংলার কৃষক সমাজের বাস্তব জীবনচিত্র এসব নাটকের উপজীব্য। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার অসারতা প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে নাটক রচনায় আত্মনিয়োগ। কলকাতায় মৃত্যু। গানের জগতে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল কাজী নজরুল ইসলামের সংগে। তার লেখা বহু গান এখন নজরুলগীতি বলে প্রচলিত আছে। সহস্রাধিক জনপ্রিয় বাংলা গানের এই গীতকারের কোনো গীতসংকলন নেই।

তুলসী লাহিড়ী রচিত নাটকসমূহের নাম- 

দুঃখীর ঈমান

• মায়ের দাবি (১৯৪১)

• পথিক (১৯৫১),

• লক্ষ্মীপ্রিয়ার সংসার (১৯৫৯),

• মণিকাঞ্চন,

• মায়া-কাজল,

• চোরাবালি,

• সর্বহারা

গাইবান্ধা নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (গানাসাস)-এর মুক্তমঞ্চের নাম তুলসী লাহিড়ীর নামে রাখা হয়েছে।

২২জুন, ১৯৫৯ তিনি মারা যান।


তথ্যসুত্র:

১)সুবোধ সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, নভেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠা ২৭৫।

মন্তব্য লিখুন :