করোনা কালের কিছু কথা!

লেখক

২০১৯ সালের শেষের দিকে চীনের উহান শহরে নভেল করোনাভাইরাসের উৎপত্তি। এরপর থেকে বিশ্বের একের পর এক রাষ্ট্রে শুরু হয় এই ভাইরাসের সংক্রমণ। বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্রে বাড়তে থাকে সংক্রমণ আর মৃত্যু। এই ভাইরাসের কোন ওষুধ না থাকায়, এই ভাইরাস রোধের জন্য এক মাত্র উপায় লকডাউন। শুরু হয় একের পর এক দেশ লকডাউন।

২০২০ সালের জানুয়ারি শেষের দিকে বাংলাদেশে এই ভাইরাস নিয়ে শুরু হয় সভা-সেমিনার। পেশায় সাংবাদিক হওয়ায় তখন অফিস থেকে দায়িত্ব দেয়া হলো করোনার যত তথ্য আছে সব আমাকেই কাভার করতে হবে। ২৯ জানুয়ারি ২০২০ তারিখ থেকে শুরু হলো হলো করোনা নিয়ে কাজ করা। কাঁধে তুলে নিলাম করোনাভাইরসের দায়িত্ব। এরপর এই ভাইরাস নিয়ে বিস্তারিত জানা শুরু করলাম।

শুরুতেই রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআর। এই প্রতিষ্ঠানটি বৈশ্বিক এবং দেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানাতো। প্রতিদিন দুপুর ১২টায় সংবাদ সম্মেলন করতেন আইইডিসিআর’র পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা (বর্তমান অতিরিক্ত মহারিচালক স্বাস্থ্য অধিদপ্তর)। এভাবেই কেটে গেলো ফেব্রুয়ারি।

এরপর শুরু হলো মার্চ মাস। ৮ মার্চ ২০২০ দেশে প্রথম শনাক্ত হলো করোনা রোগী। এর ঠিক ১০ দিন পর ১৮ মার্চ ২০২০ তারিখে করোনায় প্রথম মারা যান দেশে। এরপর আসতে আসতে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। করোনার সংক্রমণ রোধে সরকার ২৬ মার্চ ২০২০ থেকে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে।

একে একে বন্ধ হয়ে যায় দেশের সব কিছুই। মানুষ হয়ে পড়ে ঘর বন্দি। আর করোনার ঝুঁকি মাথায় নিয়ে কাজ শুরু করে ডাক্তার, সাংবাদিক, পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মীসহ দেশের জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলী।

শুরু হয় আমাদের সংবাদকর্মীদের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা। এদিকে মনে সবসময় ভয়, করোনা হলে মৃত্যু নিশ্চিত। এই ভয় মাথায় নিয়েই শুরু করি দেশের মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দেয়ার কাজ। আর একটা জিনিস বার বার মাথা আসতো সেই সময় যে, “১৯৭১ সালে তো আমার জন্ম হয় নাই। তাই তখন দেশের জন্য কিছুই করতে পারি নাই। এখন তো বৈশ্বিক এই মাহামারিতে দেশের জন্য মৃত্যু ঝুঁকি নিয়েই কাজ করবো। মরে যেতেই তো হবো সবাইকে একদিন।”

তারপর শুরু হলো করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল, বস্তি, সড়ক, করোনা টেস্ট বুথ থেকে শুরু করে সবস্থানেই সংবাদ সংগ্রহ করা। খবর সংগ্রহের সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মৃত্যুর খরব আসতো প্রতিদিন। কখনও বা চিকিৎসা পাচ্ছেন না কেউ এমন খবর। চিরচেনা রাজধানীর অলি থেকে গলিসহ প্রধান প্রধান সড়ক দিনের বেলায় ছিল জনমানব শূন্য। সেই সময় রাত-দিন একাকার করে শুরু হলো কাজ করা।

হাসপাতালে রোগীর চাপ। হাসপাতালে স্বজনের আহাজারি। এসব প্রতিদিনই দেখতে হতো। এভাবেই আসতে আসতে দিনে দিনে দেশে করোনার সংক্রমণ দেশে বাড়তেই থাকলো। এভাবেই কেটে গেলো ২ মাস।

পরে সংক্রমণ কিছুটা কমতে থাকলে ৬৬ দিন পর স্বাস্থ্যবিধি মেনে সব সরকারি ছুটি তুলে দেয় সরকার। চলতে শুরু করে দেশের সবকিছুই। আমার করোনা কাভার থেমে নেই। 

এভাবেই কেটে গেল ২০২০। শুরু হলো ২০২১ সাল। জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারিতেও সংক্রমণ ছিল কম। ঠিক ১৩ মার্চ ২০২১ এরপর থেকে প্রতিদিন এক হাজার করে শনাক্ত হওয়া শুরু হয়। দেশে শুরু হয় করোনা দ্বিতীয় ঢেউ। শুধু দেশে নয় বিশ্বের সব দেশেই আবার করোনা ভিন্ন রূপে দেখা দেয়। দেশে রূপ নিতে থাকে করোনার ভয়ঙ্কর রূপ। বাড়তে থাকে আক্রান্ত আর মৃত্যু। হতে থাকে রেকর্ডের পর রেকর্ড। বাড়তে থাকে হাসপাতালে রোগীর চাপ। দেখা সাধারণ বেড সংকট। সংকট দেখা দেয় আইসিইউ বেডের। এমন পরিস্থিতি হয়ে গেছে এক মানুষের মৃত্যু কামনা করেন একজন। কারণ আইসিইউ সংকট। একজন মারা গেলে একজন আইসিইউ পাবেন।

করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ মোকাবিলায় ৫ এপ্রিল ২০২১ থেকে সারাদেশে এক সপ্তাহের জন্যে লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার। এরপর আবারও দ্বিতীয় দফায় বাড়ানো হয় লকডাউন। ফের তৃতীয় দফায় বাড়ানো হয় লকডাউন। এই লকডাউনে আবারও ঢাকা ছাড়তে দেখা যায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত হাজার হাজার মানুষকে। কারণ লকডাউনে সব বন্ধ থাকলে তাদের কাজ বন্ধ থাকবে। তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে চলা খুবেই কষ্টদায়ক হয়ে যাবে।

দ্বিতীয় ঢেউয়ের করোনা রূপ পরবির্তন করেছে। করোনার সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার। এসব প্রতিদিনই দেখতে হচ্ছে। হাসপাতালে গেলে মনে হয় যে মৃত্যু কত সহজ। মৃত্যু চিরন্ত সত্য। তবুও এমন মৃত্যু কেউ চায় না। অ্যাম্বুলেন্সে স্বজনকে নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাসপাতালে ছুটছেন স্বজনরা, শুধু একটা আইসিইউ বেডের জন্য। তবুও মিলছে না আইসিইউ বেড। কোথাও নেই কোন আসার বাণী। দিন দিন চারদিক শুধু মৃত্যুর খবর। মাঝে মাঝে মনে হয়। সারাদিন এতো মানুষের খবর সংগ্রহ করি। কত খবর দেখাই। হয়তো এভাবেই নিজেকেই কোন একদিন এই করোনার কাছে হার মানতে হবে। অসুস্থতার সময় একটা সাধারণ বেডও জুটবে না কপালে।

এখনও সময় আছে, এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। তা না হলে এই ভাইরাসকে রোধ করা সম্ভব নয়। অনেকেই বলতে পারেন যে, করোনা ভাইরাস বলতে কিছুই নাই। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে পারি। একবার ঘুরে আসুন বিভিন্ন কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতাল বা যেসব হাসপাতালে করোনার রোগী ভর্তি আছেন। তাহলেই বুঝবেন। 

আবার অনেকেই বেলতে পারেন, করোনা ভ্যাকসিন বের হয়েছে। তাহলে এতো কিসের সংক্রমণ। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, ভ্যাকসিন দিলে করোনা হবে না, এই কথা কোথা্ও কেউ বলে নাই। বলেছে, সংক্রমিত হলেও মৃত্যুঝুঁকি হবে কম। তাই ভ্যাকসিন নিলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে সুস্থ রাখতে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। সঠিক ভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানলে করোনাকে আমরা রোধ করতে সক্ষম হবো। আর জয়ীর বেশেই ফিরবো। করোনাকে ভয় নয়, সচেতনাতা দিয়েই জয় করতে হবে।

লেখক: আল্লামা ইকবাল অনিক, স্টাফ রিপোর্টার, জিটিভি

মন্তব্য লিখুন :