ঐতিহাসিক বদর দিবস ও ইসলামের বিজয় নিশান

প্রায় দেড় হাজার বছর আগে দ্বিতীয় হিজরির আজকের এই দিনে মদিনা থেকে প্রায় ৭০ মাইল দূরে বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের লড়াই ‘বদরযুদ্ধ’। মূলত বদর ছিলো একটি কূপ এর নাম। এ যুদ্ধকে বলা হয় সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়কারী যুদ্ধ। 

বিশ্বনবীর মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছর প্রথমবার রোজা পালনকালে ১৭ রমজান, মাগফিরাতের সপ্তম দিন (৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ মার্চ) ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং মুসলমানরা অবিস্মরণীয় বিজয় লাভ করে। প্রিয় নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নিয়ে আসা ধর্ম ইসলামের বিজয় নিশান উড়তে শুরু করে এই গৌরবময় যুদ্ধ থেকেই।

বদর প্রান্তরে ৩১৩ জন সাহাবি নিয়ে সে সময়ের আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত মক্কার কাফেরদের সঙ্গে বদরের যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের ফেরেশতা বাহিনী দ্বারা বিশেষ সাহায্য করে বিজয় দান করেছিলেন। 

বদর যুদ্ধের পটভূমি ও বিজয় নিশান:

তখন কুরাইশদের অন্যতম ব্যবসা কেন্দ্র ছিলো সিরিয়া। একদল কুরাইশ ব্যবসায়ী আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে যুদ্ধাস্ত্র ও অন্যান্য মালামাল কিনে মদিনা হয়ে সিরিয়া থেকে মক্কায় ফিরছিল। পথে সরঞ্জামাদি হারানোর আশঙ্কায় মক্কায় কুরাইশদের কাছে বিপৎসংকেত পাঠানো হয়। তখন কুরাইশদের নেতা ছিলেন আবু জেহেল। আবু সুফিয়ানের বিপদসংকেত পেয়ে তিনি এক হাজার অশ্বারোহী সশস্ত্র যোদ্ধা, অসংখ্য উটসহ মদিনা অভিমুখে ছুটে আসেন। উতবা ইবনে রাবিয়া, শাইবা ইবনে রাবিয়া, আবুল বাখতারি ইবনে হিশাম, হাকিম ইবনে হিজাম, নওফেল ইবনে খুয়াইলিদ, হারিস ইবনে আমির, তুয়াইমা ইবনে আদি, নাদার ইবনে হারিস, জামআ ইবনে আসওয়াদ ও উমাইয়া ইবনে খালাফসহ মক্কার অনেক অভিজাত ব্যক্তি মক্কার বাহিনীতে যোগ দেন। কেউ কাফেলায় নিজেদের সম্পদ রক্ষা, কেউ ইবনে আল-হাদরামির মৃত্যুর বদলা নিতে এ যুদ্ধে যোগ দেন।

 এ সংবাদ জানতে পেয়ে মহানবী (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন এবং যুদ্ধের আহ্বান করেন। কুরাইশদের বিশাল বাহিনীর সাথে অল্প সংখ্যক মুসলিমরা এসময় মুখোমুখি না হয়ে ফিরে যেতে পারত কিন্তু এর ফলে কুরাইশদের ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেত এবং তারা অগ্রসর হয়ে মদিনা আক্রমণ করতে পারত। তাই এই যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়েছিলো। 

বদর প্রাঙ্গণে মহানবী (সা.) উচু টিলার ওপর ও বদর কূপের কাছে নিরাপত্তা তাঁবু ও নেতৃত্ব মঞ্চ স্থাপন করলেন। যাতে করে সমগ্র প্রাঙ্গণের অবস্থার ওপর দৃষ্টি রাখতে পারেন। 

এদিকে মুসলমানদের নির্মিত হাউজের (চৌবাচ্চা)  থেকে পানি পান করার অথবা সেটি নষ্ট করার সিদ্ধান্ত নেন আসওয়াদ মাখযুমী। এজন্য সে প্রাণ বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত ছিল না। তাই মুশরিকদের ছাউনি থেকে বেরিয়ে সে হাউজের নিকটে এল। সে সময় ইসলামের মহান সৈনিক হযরত হামযাহ্ (রা.) সেখানে প্রহরারত ছিলেন। সে পানির নিকট পৌঁছে তাঁর সঙ্গে যুদ্ধে রত হলে তিনি তরবারির এক আঘাতে তার এক পা বিচ্ছিন্ন করলেন। এ অবস্থায়ই সে তার উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে পানির দিকে অগ্রসর হলে হযরত হামযাহ্ সেখানে তাকে হত্যা করলেন। এই ঘটনাটিই যুদ্ধ অনিবার্য করে তোলে। এবং যুদ্ধের সূচনা হয়।

তৎকালীন রীতি অনুযায়ী দ্বন্দ্বযুদ্ধের মাধ্যমে লড়াই শুরু হয়। কুরাইশদের মধ্য থেকে উতবা ইবনে রাবিয়া, শাইবা ইবনে রাবিয়া ও ওয়ালিদ ইবনে উতবা লড়াইয়ের জন্য অগ্রসর হন। তাদের লড়াইয়ের আহ্বান শুনে আনসারদের মধ্য থেকে আউফ ইবনে হারিস, মুয়াবিজ ইবনে হারিস ও আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা এগিয়ে আসেন। কিন্তু কুরাইশ যোদ্ধারা তাদেরকে কটাক্ষ করে বলেন যে তারা তাদের যোগ্য না এবং যেন কুরাইশদের সমশ্রেণীর কাউকে লড়াইয়ের জন্য পাঠানো হয়। এরপর তাদের বদলে হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব, উবাইদা ইবনে হারিস ও আলি ইবনে আবি তালিবকে পাঠানো হয়। হামজার সাথে শাইবা, আলির সাথে ওয়ালিদ ও উবাইদার সাথে উতবা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। কুরাইশ পক্ষের তিনজনই লড়াইয়ে নিহত হয়।

কুরাইশ তিনজনই লড়াইয়ে নিহত হওয়ার পরই যুদ্ধ পুরোপুরি শুরু হয়ে যায়। শুরু হয় সম্মিলিত আক্রমণ। অত:পর এ যুদ্ধে ১৪ জন মুসলমান ও ৭০ জন কাফির নিহত হয় এবং ৭০ জন মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। বন্দীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নাদার (নাজার) ইবনে হারেস,উকবা ইবনে আবি মুয়ীত,আবু গাররাহ্,সুহাইল ইবনে আমর,আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং আবুল আস।

এই যুদ্ধ বিজয়ের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের জয়ধ্বণি উচ্চারিত থাকে। ধীরে ধীরে বাড়তে মুসলিমদের সংখ্যাও।

মন্তব্য লিখুন :