পুনরায় পরিকল্পনা করুন, তৈরি করুন এবং বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধার করুন

আবারো এসেছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এদিনটিকে ঘিরে আমাদের আয়োজনের অন্ত থাকে না। অন্ত থাকে না এই দিবসটি পালনেরও। কিন্তু সারা বছর পরিবেশের জন্য আমরা কতটুকু সময় ব্যয় করি? সেটি ভাবার সময় এসেছে। আমরা প্রতিনিয়ত যে দূষণ আর জঞ্জালের পৃথবী তৈরি করছি কিন্তু আমরা কি ভেবেছি ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আমরা কী রেখে যাচ্ছি ? বিশেষ করে কেমন পৃথিবী রেখে যাচ্ছি?

বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর নির্দিষ্ট একটি বিষয়কে বিবেচনা করে পরিবেশ দিবসের থিম বা প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়। তিনটি বিষয়কে বিবেচনা করে ২০২১ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে।


বাস্তুসংস্থান কী?

বাস্তুসংস্থান হলো ‘বেঁচে থাকার জন্য পরিবেশের বিভিন্ন জড় বস্তুর ওপর নির্ভরশীল। একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসবাসকারী জীব সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সদস্যের সঙ্গে জড় উপাদানগুলোর পারস্পরিক ক্রিয়াই হলো ওই স্থানের বাস্তুসংস্থান। প্রত্যেক বাস্তুসংস্থানের মূলত দুটি উপাদান রয়েছে। যথা- অজীব উপাদান ও সজীব উপাদান। আমার জানি, জলবায়ু, পরিবেশ এবং মানুষ একে অপরের সঙ্গে অতি নিবিড়ভাবে যুক্ত। প্রত্যেকটি জীব প্রজাতির মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত নিবিড় পারস্পরিক সম্পর্ক। মানুষ তার দৈনিন্দন জীবনের প্রায় সব কিছুই পায় পরিবেশ থেকে। আবার এই মানুষই তার প্রয়োজনে এবং অপ্রয়োজনে সব থেকে বেশি ক্ষতি করে পরিবেশের। মানুষ যতই আধুনিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত হচ্ছে, পরিবেশের উপরে ততই চাপ পড়ছে। ফলে বাড়ছে কল কারখানার কালো বিষাক্ত ধোঁয়া এবং বর্জ্য। বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য, বাসস্থান এবং অন্যান্য চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে বিলুপ্ত হচ্ছে বনাঞ্চল, নদী-নালা, খাল-বিল। সেই সঙ্গে বিলুপ্ত হচ্ছে এসব স্থানে বসবাস করা বিভিন্ন ধরণের ছোট বড় বন্যপ্রাণী।  

সুদীর্ঘকাল ধরে, আমরা আমাদের গ্রহের ইকোসিস্টেম অর্থাৎ বাস্তুসংস্থানগুলো শোষণ এবং ধ্বংস করে চলেছি। বলা হয়ে থাকে প্রতি তিন সেকেন্ডের মধ্যে আমরা একটি বিশ্বকাপ ফুটবল মাঠের সমান বনভূমি হারাচ্ছি এবং গত শতাব্দীতে আমরা আমাদের অর্ধেক এবং জলাভূমি ধ্বংস করেছি। বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়ন ১.৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও আমাদের প্রবালদ্বীপ প্রায় ৫০ শতাংশ ইতোমধ্যে হারিয়ে গিয়েছে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে প্রবাল দ্বীপের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে। ইকোসিস্টেমের ক্ষতি হলে বিশ্বের বন ও পিটল্যান্ডগুলো কার্বন সাগরে নিমজ্জিত হবে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ টানা তিন বছর ধরে বেড়েছে এবং আমাদের গ্রহটি সম্ভাব্য বিপর্যয়পূর্ণ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য গতিতে রয়েছে। এদিকে কোভিড-১৯ এর উত্থানও বাস্তবে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতির পরিণতি কত বিপর্যয়কর হতে পারে তা দেখিয়েছে। প্রাণিদের প্রাকৃতিক আবাসক্ষেত্র সঙ্কুচিত করে, আমরা করোনভাইরাসসহ অন্যান্য রোগ জীবানু সহজে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য পরিবেশ ও পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দিয়েছে। ঠিক এসব কারণে এবারের থিমটি বাস্তুতন্ত্র পুনরদ্ধারে ফোকাস করছে এবং এর থিমটি ‘পুনরায়-কল্পনা করুন, তৈরি করুন এবং পুনরায়  বাস্তুতন্ত্রের উদ্ধার করুন।’

ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধার কথাটির অর্থ পাহাড়ের শিখর থেকে সমুদ্রের গভীরতায় বিলুপ্তির দ্বাপ্রান্ত থেকে উদ্ভিদ এবং প্রাণিকে ফিরিয়ে আনা।  প্রকৃতিকে শোষণের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিরাময়ের দিকে নিয়ে যাওয়া। প্রকৃতির যে প্রতিনিয়ত ক্ষতি হচ্ছে তা থেকে প্রতিরোধ করা, থামানো এবং তার বিপরীত পরিবর্তন করা। এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মাধ্যমে জাতিসংঘ ‘ইকোসিস্টেম রিস্টোরেশন (২০২১-২০৩০)’ দশক ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে তারা আশা করছেন কয়েক মিলিয়ন হেক্টর বন, কৃষিজমি থেকে পাহাড়ের শীর্ষ থেকে সমুদ্রের গভীরতা পর্যন্ত পুনরুদ্ধার করার একটি বৈশ্বিক মিশনের পরিণত হবে। একটি বিষয় স্পষ্ট যে, আমরা কেবল স্বাস্থ্যকর বাস্তুসংস্থান দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করতে পারি, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারি এবং জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস বন্ধ করতে পারি।


বাস্তুতন্ত্রের উপর বিনিয়োগ যেন আমাদের ভবিষ্যতের উপর বিনিয়োগ

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২১, যা পাকিস্তানের সাথে এই বছরের আনুষ্ঠানিক উদযাপনের জন্য আয়োজক দেশ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে, আমাদের ক্ষতিগ্রস্থ বাস্তুতন্ত্রকে পুনরুদ্ধারে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বন থেকে উপকূলের পিটল্যান্ডস পর্যন্ত আমরা সকলেই আমাদের বেঁচে থাকার জন্য স্বাস্থ্যকর বাস্তুসংস্থার উপর নির্ভর করি। বাস্তুতন্ত্রকে জীবিত জীব - উদ্ভিদ, প্রাণী, মানুষ - তার চারপাশের সাথে সংযোগ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে। এর মধ্যে প্রকৃতি অন্তর্ভুক্ত, তবে নগর বা খামারগুলির মতো মানবসৃষ্ট সিস্টেমও রয়েছে।

তবে এর মধ্যে আমরা প্রত্যেকে নিতে পারি এমন অনেকগুলি ছোট ছোট উদ্যোগ যা আমাদের বাস্তুতন্ত্রকে আরো স্বাস্থ্যবান করে তুলতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে প্রচুর গাছ লাগানো, আমাদের শহরগুলিকে সবুজ করে তোলা, আমাদের বাগানগুলি পুনর্র্নিমাণ করা বা নদী এবং উপকূলের পাশাপাশি জঞ্জাল পরিষ্কার করা।

বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগ করা প্রতিটি ডলারের জন্য রিটার্ন হিসেবে সমাজের জন্য কমপক্ষে সাত থেকে ত্রিশ ডলার প্রত্যাশা করা যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জর্জরিত। এমন প্রেক্ষাপটে প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং পৃথিবীকে নিরাপদ এবং বাসযোগ্য রাখতে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজকের এই দিনটি পালন করা হয়।

কিছু দেশ ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ থেকে ফিরে আসার কৌশলগুলোর অংশ হিসাবে পুনরুদ্ধার খাতে বিনিয়োগ করেছে। অন্যরা ইতোমধ্যে পরিবর্তিত একটি জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে তাদের পুনরুদ্ধারের দিকে ঝুঁকছেন।


যেভাবে এলো পরিবেশ দিবস

এখন একটু পিছনে ফেরা যাক। কিভাবে এলো পরিবেশ দিবসের ধারণা? ১৯৭০ সালের ঘটনা। জলবায়ু সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় দু’কোটি মানুষ। সেই থেকেই দিনটির সূত্রপাত। ১৯৭০ সালে মার্কিন সিনেটর গেলর্ড নেলসন দিবসটির প্রচলন করেন। এ কারণে পরবর্তীকালে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ১৫০টি দেশে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয়। গতবছরের মতো এবারও করোনা মহামারিতে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এবারের থিমটি অবশ্যই অন্যবারের চেয়ে একেবারে ভিন্ন।


২০২১ এর প্রতিপাদ্য: বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার

২০২১ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য হ’ল ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধার এবং এর মাধ্যমে ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধারের জন্য জাতিসংঘের দশকের সূচনা হবে। বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার বিভিন্ন রূপ নিতে পারে গাছ বাড়ানো, সবুজ শহর, আমাদের জমিগুলোতে কৃষিজমি এবং অবকাঠামো প্রয়োজন, উদ্যান পুনর্র্নিমাণ এবং নদী ও উপকূল পরিষ্কার করা প্রভৃতি। প্রকৃতির সাথে শান্তি স্থাপন করতে পারে এটিই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রেখে যেতে। তাই এই প্রতিপাদ্যের প্রয়োজন ছিল আরো আগেই। এখন থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে অবনমিত স্থলজ ও জলজ বাস্তুতন্ত্রের ৩৫০ মিলিয়ন হেক্টর পুনরুদ্ধারের ফলে বাস্তুতন্ত্রের  মাধ্যমে মার্কিন ডলারে ৯ ট্রিলিয়ন ডলার অর্জন করতে পারে। এই পুনরুদ্ধার কর্মসূচীর মাধ্যমে বায়ুমন্ডল থেকে ১৩ থেকে ২৬ গিগাটন গ্রিনহাউস গ্যাসগুলি সরিয়ে ফেলা সম্ভব। এই ধরনের কর্মকান্ডের অর্থনৈতিক সুবিধা বিনিয়োগ ব্যায়ের চেয়ে রিটার্ণ সাত থেকে ত্রিশগুন অতিক্রম করবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।


২০২১ আয়োজক দেশ পাকিস্তান

প্রতিটি বিশ্ব পরিবেশ দিবস একটি আলাদা দেশ দ্বারা আয়োজন করা হয়, যেখানে সরকারী উদযাপন হয় এবং এই বছরের আয়োজক পাকিস্তান। সুনামির ফলে পাকিস্তানে প্রায় ১০০ বিলিয়ন গাছ নষ্ট হয়ে যায়। পাকিস্তান সরকার আগামী পাঁচ বছরে গাছ লাগানোর মাধ্যমে পুনরুদ্বারের উদ্যোগ নিয়েছে। তারা পরিকল্পনা করছে তাদের আগামী পাঁচ বছরের কর্মসূচীর মধ্যে ম্যানগ্রোভ এবং বন পুনরুদ্ধার করার পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, পাবলিক পার্ক এবং গ্রিনবেল্টসহ শহুরে প্রয়োজনীয় স্থানে গাছ লাগানো হবে।  

ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধারের উপর জাতিসংঘ দশক (২০২১-২০৩০)

ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধারের বিষয়টিতে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রায় ৭০ টি দেশের বেশি দেশ সমর্থন করেছে। ফলে ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধারের বিষয়ে জাতিসংঘের দশকের ঘোষণা দিয়েছে। মানুষ এবং প্রকৃতির কল্যাণে বিশ্বজুড়ে বাস্তুন্ত্রের সুরক্ষা এবং পুনর্জাগরণের জন্য এটি একটি আহ্বান। ইকোসিস্টেমগুলোর ক্ষয় রোধ করা এবং বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য সেগুলি পুনরুদ্ধার করা। আমরা কেবল স্বাস্থ্যকর বাস্তুসংস্থান দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করতে পারি। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারি এবং জীববৈচিত্রের ধ্বংস বন্ধ করতে পারি।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আন্দোলন এবং আলোচনা পৃথিবী জুড়েই চলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, করোনা ভাইরাস অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত মানুষের। এ পৃথিবীকে বাস-উপযোগী রাখতে সকলেরই যথাযথ ভূমিকা রাখা উচিত। এক্ষেত্রে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এর অঙ্গীকার আজও বিশ্বজনীন। কবি বলেছিলেন, ‘এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি- নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’।


লেখক: শিক্ষার্থী ও সাংবাদকর্মী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

জাহিদুল ইসলাম (জেডআই)

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য লিখুন :