তফসিলের আগেই সরব মনোনয়ন প্রত্যাশীরা

একাদশ জাতীয় সংসদের শূন্য হওয়া তিন আসন ঢাকা-১৪, কুমিল্লা-৫ ও সিলেট-৩-এ উপনির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা হয়নি। করোনার কারণে এমনকি নির্বাচনি প্রস্তুতি শুরু করেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কিন্তু এরই মধ্যে এসব আসনে নৌকার মনোনয়ন পেতে মাঠে নেমেছেন শতাধিক ব্যক্তি। এর মধ্যে প্রয়াত সংসদ-সদেস্যর স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েসহ স্বজনরা যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাও। বিভিন্ন মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রার্থিতার কথা জানান দিচ্ছেন। দোয়া ও ইফতার মাহফিল, ভার্চুয়াল সভাসহ ঘরোয়া ও বাইরের নানা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হচ্ছেন। ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে টানাচ্ছেন পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুনও। সরব রয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। 

এদিকে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের কাদা ছোড়াছড়ি না করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে আওয়ামী লীগ। কেউ এর ব্যত্যয় করলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। তবে দলটির নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা এখনই এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চান না। তারা বলছেন, তফসিল ঘোষণার পরে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু হবে। তখন মনোনয়ন বোর্ড আগ্রহীদের মধ্যে থেকে ত্যাগী ও যোগ্যদের আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত মনোনয়ন দেবে।

৪ এপ্রিল সংসদ-সদস্য আসলামুল হকের মৃত্যুর পর ১৩ এপ্রিল ঢাকা-১৪ আসনটি শূ্ন্য ঘোষণা করে সংসদ সচিবালয়। এর গেজেট নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির অবনতির কারণে আসনটিতে উপনির্বাচন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৭, ৮, ৯, ১০, ১১ ও ১২ নং ওয়ার্ড এ আসনের অন্তর্ভুক্ত। এসব এলাকা মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ঈদ শুভেচ্ছার ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে।

আসলামুল হকের আসনে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে স্ত্রী মাকসুদা হকের নাম আলোচনায় আছে। এর বাইরে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচি ও যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নাম রয়েছে আলোচনায়। ঢাকা মহানগর উত্তর যুব মহিলা লীগের সভাপতি ও সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ-সদস্য সাবিনা আক্তার তুহিন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। এবারও প্রত্যাশী তিনি। এ ছাড়া দারুস সালাম থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী ফরিদুল হক হ্যাপির নামও শোনা যাচ্ছে।

জানতে চাইলে সাবিনা আক্তার তুহিন বলেন, আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা এ এলাকায়। আমি সবসময় এলাকার মানুষের পাশে ছিলাম, আছি, থাকব। তারা বিপদে-আপদে আমাকে পাশে পায়। তাই আমার বিশ্বাস তৃণমূলের মানুষ ও নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে আছে এবং থাকবে। তাই দল আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে বিশ্বাস করি। কাজী ফরিদুল হক হ্যাপি বলেন, ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে আজ ৩০ বছর ধরে সুখে-দুঃখে এ আসনের মানুষের পাশে আছি। দল যদি মনোনয়ন দেয় তাহলে নির্বাচিত হয়ে ঢাকা-১৪ আসনে শান্তি-শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে চাই।

ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে একটি পোস্টার শেয়ার করে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন মনোয়ার হোসেন ডিপজল। সেই পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনা যদি আমাকে ঢাকা-১৪ আসনে সংসদ-সদস্য প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন প্রদান করেন, আমার এলাকার মানুষের সেবা করার সুযোগ দেন, তাহলে আমি নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী।’ এ ছাড়া মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান ও এবিএম মাজহারুল আনাম, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোবাশ্বের চৌধুরীসহ মিরপুর, শাহআলী ও দারুস সালাম থানা, রূপনগর থানার আংশিক এবং সাভার উপজেলার কাউন্দিয়া ইউনিয়ন থেকে প্রায় অর্ধশত ব্যক্তি আওয়ামী লীগের মনোনয়নের মিছিলে যোগ দিচ্ছেন।

সাবেক আইনমন্ত্রী ও কুমিল্লা-৫ থেকে পাঁচবার নির্বাচিত সংসদ-সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু ১৪ এপ্রিল ইন্তেকাল করলে আসনটি শূন্য হয়। শোক না কাটতেই এখানে মাঠে নেমেছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। শোকসভা ও শোক জ্ঞাপনের পাশাপাশি উপনির্বাচনে নিজের প্রার্থিতার কথা জানান দিচ্ছেন। দোয়া মাহফিল, এতিমখানায় ইফতার মাহফিল, কেউ ভার্চুয়াল স্মরণসভা আয়োজন এবং কেউবা ঘরোয়া পরিবেশে ইফতার পার্টির মাধ্যমে জানান দিচ্ছেন নিজেদের উপস্থিতি। ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে টানাচ্ছেন পোস্টার-ফেস্টুনও। সরব রয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও।

এ আসনে প্রার্থী হিসাবে আব্দুল মতিন খসরুর পরিবারের চারজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। তারা হলেন স্ত্রী সেলিনা সোবহান খসরু, ছেলে মুনেফ ওয়াসিফ, মেয়ে ডা. উম্মে হাবিবা দিলশাদ মুনমুন ও ভাই অ্যাডভোকেট আবদুল মমিন ফেরদৌস। চূড়ান্ত করতে পরিবারের মধ্যে আলোচনা চলছে। জানতে চাইলে সেলিনা সোবহান খসরু যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনি এলাকার আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা যদি চান ও কেন্দ্র থেকে যদি মনোনয়ন দেওয়া হয় তবে বিষয়টি ভেবে দেখব। অ্যাডভোকেট আবদুল মমিন ফেরদৌস বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে মুনেফ ওয়াসিফ ও মেয়ে ডা. উম্মে হাবিবা দিলশাদ মুনমুন যদি প্রার্থী না হয় তবে আমি নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাই।

পরিবারের বাইরে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেনের নাম আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল হাশেম, সহ-সভাপতি লায়ন ইঞ্জি মো. আল আমিন, উপজেলা চেয়ারম্যান আখলাক হায়দার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা অধ্যক্ষ সেলিম রেজা সৌরভ, ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর খান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল বারী, যুবলীগ নেতা এহতেশামুল হাসান ভূইয়া রুমি, ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা দিদার মো. নিজামুল ইসলাম, অধ্যক্ষ মো. আলী চৌধুরী মানিক, মেজর জেনারেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান, আব্দুস সালাম বেগ, আওয়ামী লীগ নেতা শাহজালাল মজুমদার, তারিক হায়দার, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার সোহরাব খান চৌধুরী, বিএলএম গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ মতিন, আব্দুল জলিল, আবু জাহের, শাহজালাল মোল্লা, উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা মো. মাহতাব, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোস্তফা কামাল, বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রেজা আলোচনায় রয়েছেন।

জানতে চাইলে সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, প্রয়াত এমপির স্ত্রী ও ভাই, সেলিম রেজা সৌরভসহ নেতৃত্বে থাকা অন্যদের নিয়ে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে সবচেয়ে বড় কথা নেত্রী (আওয়ামী লীগ সভাপতি) যাকে মনোনয়ন দেন তার পক্ষে কাজ করব। ইহতেশামুল হাসান ভূইয়া রুমি বলেন, বিপদে আপদে সব সময় এলাকার মানুষের সঙ্গে আছি। তাদের জন্য কাজ করেছি। দল থেকে যদি মনোনয়ন দেওয়া হয় এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে চাই। দিদার মো. নিজামুল ইসলাম বলেন, নেত্রী যদি আমাকে যোগ্য মনে করেন তাহলে নির্বাচিত হয়ে এলাকার মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।

মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর মৃত্যুতে সিলেট-৩ আসনটি শূন্য হয়। ডজনখানেক নেতা এ আসনে দলীয় মনোনয়ন চাচ্ছেন। এ ছাড়া মাহমুদ উস সামাদের স্ত্রী ফারজানা সামাদ চৌধুরীও দলীয় প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, সিলেট-৩ আসনের নির্বাচনি এলাকার আপামর জনতার সুখ-দুঃখের সাথী ছিলেন মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী। জীবদ্দশায় তার জীবনসঙ্গিনী হিসাবে তার সব কর্মকাণ্ডে অতীতে যেমন পাশে ছিলাম, আগামী দিনেও একইভাবে দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জবাসীর কাছে থাকতে আমি আগ্রহী। জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ ও আশীর্বাদ পেলে মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী এমপির অসমাপ্ত উন্নয়ন কাজগুলো সম্পন্ন করতে আমি আগামী দিনে সিলেট-৩ নির্বাচনী এলাকার জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে ভূমিকা রাখতে চাই।

এ আসনের দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে আরও রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের ত্রাণবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান গৌছ সুলতান, বিএমএ’র মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন-সিলেট ব্যুরোর আজমল খান ও ব্রাহ্মণপাড়া প্রতিনিধি সৌরভ মাহমুদ হৃদয়।



সূত্র: দৈনিক যুগান্তর

মন্তব্য লিখুন :